রাঙামাটি মহকুমা সদরের এসডিও ছিলেন যে আবদুল আলী, তিনি বেঁচে নেই। এই বীর
মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু হয়েছিল মর্মান্তিকভাবে। দৈবাৎ যদি বেঁচে থাকতেন, তার
মুখ থেকে নিখুঁতভাবে জানা যেতো, পাকিস্তান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে
থাকার পরও একাত্তরের এপ্রিলে কী করে তিনি দুটি স্পিডবোটযোগে মহালছড়ি থেকে
রাঙামাটিতে নিয়ে এসেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দলকে। জানতাম, তার সেই এক
মূহূর্তের ভুলের কথা, যার ফল তিনি পেয়েছিলেন নিজের জীবন দিয়ে। ঘূণাক্ষরেও
তিনি টের পাননি, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আসার আগেই চট্টগ্রামের নতুনপাড়ায়
ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট সেন্টারে আগেই চাকমা রাজা গোপনে বৈঠক করে এসেছেন
পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে। বৈঠকের পরপরই সঙ্গোপনে চাকমা রাজার
সঙ্গে রাঙামাটি আসে পাকিস্তানি কয়েকজন জুনিয়র অফিসার। প্রায় একই সঙ্গে
কাপ্তাই থেকে পাকিস্তানি হানাদারদের একটি দল কয়েকটি লঞ্চ ও স্ডিপবোট নিয়ে
রাঙামাটি এসে চুপিসারে অবস্থান নেয়। যা হওয়ার তাই হল। ভারত প্রত্যাগত
মুক্তিযোদ্ধাদের দল রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের বাংলোর কাছাকাছি পৌঁছানোর
সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে
মুক্তিযোদ্ধারা ধরা পড়লেন। একপর্যায়ে কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই রাঙামাটি দখল করে
নেয় পাক হানাদাররা। সেই এসডিও আবদুল আলীর পরিণতি হয়েছিল মর্মান্তিক।
শরবিন্দু শেখর চাকমার 'মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রাম' বইয়ে বর্ণনা দেওয়া
হয়েছে এভাবে- রাঙামাটি পুলিশ লাইনের এক ব্যারাকে আটক করে রেখে আবদুল আলীর
শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্লেড দিয়ে আঁচড় দিয়ে সেসব জায়গায় লবণ দেওয়া হয়েছিল।
এরপর তাকে একটি জিপের পিছনে বেঁধে টেনে রাঙামাটির বিভিন্ন জায়গায় ঘোরানো
হয়।
নেপথ্যে সেই একজন
এই সবকিছুর মূলে, সমস্ত ঘটনার নেপথ্যে কলকাঠি নেড়ে গেছেন একজন দালাল, একজন বিশ্বাসঘাতক, একজন যুদ্ধাপরাধী - চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়। নিজের আত্মজীবনী 'ডিপার্টেড মেলোডি'তে সেই ত্রিদিব রায়ের নিজের স্বীকারোক্তি এসেছে এভাবে- ১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল সকালে তিনি (রাজা ত্রিদিব রায়) তার ভগ্নিপতি কর্নেল হিউম, ম্যাজিস্ট্রেট মোনায়েম চৌধুরী, হজরত আলী এবং আরো কয়েকজন বাঙালি মুসলিম লীগ নেতাসহ চট্টগ্রামের নতুন পাড়ায় অবস্থিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেন্টারের পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেন। পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয় যে ম্যাজিস্ট্রেট মোনায়েম চৌধুরী এবং রাজা ত্রিদিব রায়ের সঙ্গে আসা আরো কয়েকজন বাঙালি ঢাকা থেকে আসা জুনিয়র অফিসারকে সঙ্গে করে কাপ্তাইয়ে যাবেন। ঠিক সেদিনই বিকেলে কাপ্তাই থেকে সেনাবাহিনীর একটি দল কয়েকটি লঞ্চ এবং স্পিডবোট নিয়ে রাঙামাটি আসে এবং বিনা প্রতিরোধে দখল করে নেয়।
যুদ্ধাপরাধী এক সাচ্চা পাকিস্তানির প্রতিকৃতি
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বেঁচে থাকলে বিস্মিত হতেন আজ। কারণ ত্রিদিব রায় তার চেয়েও সাচ্চা পাকিস্তানি হয়ে উঠেছিলেন। পাকিস্তানি হওয়া অপরাধ নয়, কিন্তু এই লোকের গায়ে যুদ্ধাপরাধের ঘনঘোর কালিমা লেগে ছিল আমৃত্যু। একাত্তরে এই লোক স্বজাতির সঙ্গে বেঈমানি করে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যায় প্রত্যক্ষ মদদ দিয়ে গেছেন। একাত্তরে রাঙামাটিতে যতো গণহত্যা চলেছে, সবগুলোর পেছনেই তার প্রত্যক্ষ মদদ ছিল। পরাজয় আঁচ করতে পেরে মুক্তিযুদ্ধের শেষ সময়ে তিনি পাকিস্তানে চলে যান। ওই সময়ে তাকে পাকিস্তান সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে শ্রীলংকা, বার্মা, থাইল্যান্ডসহ বৌদ্ধপ্রধান দেশগুলোতে পাঠানো হয় পাকিস্তানের পক্ষে সমর্থন আদায়ের জন্য। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহায়তার অভিযোগে দালাল আইনে অভিযুক্তদের একটি তালিকা প্রকাশ করা ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি, দৈনিক বাংলায়। ওই তালিকার ৮ নম্বরে রাজা ত্রিদিব রায়, আর ১২ নম্বরে গোলাম আযম! ১২ নম্বর দালাল তবু ষড়যন্ত্রের নতুন মিশন নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে এসেছিল, কিন্তু আট নম্বর দালাল ত্রিদিব রায় পাকিস্তানের পদসেবাতেই নিজেকে নিয়োগ করেছিলেন। খোদ পাকিস্তানের মানুষই তাকে বিদ্রুপ করে বলতো- উজির-ই-খামাখা। আজন্ম এই বিদ্রুপ মাথায় নিয়েও তিনি পেয়ারা পাকিস্তানের সেবা করে গেছেন। ১৯৭২ সালে ত্রিদিব রায়কে ফিরিয়ে আনার জন্য তার স্ত্রী বিনীত রায়কে পাকিস্তানে পাঠিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। তিনি ঘৃণাভরে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। পাকিস্তানের প্রতি এই আনুগত্যের স্বীকৃতি হিসেবে ওই সময়ের পাকি প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভূট্টো তার সম্মানে বিশেষ ভোজসভার আয়োজন করেছিলেন। পরে কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রিত্ব ছাড়াও ত্রিদিব রায় বিভিন্ন দেশে হয়েছেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত।
যুদ্ধাপরাধীকে বরণে সরকারের বিস্ময়কর আগ্রহ
এই গুণধর যুদ্ধাপরাধী ত্রিদিব রায়, যিনি বর্তমান চাকমা সার্কেলপ্রধান ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ের বাবা, গত ১৭ সেপ্টেম্বর ৭৯ বছর বয়সে মারা গেছেন তার স্বপ্নভূমি পাকিস্তানের ইসলামাবাদে। সেই পাকিস্তানি দালালের লাশ এখন ৩০ লাখ শহীদের রক্তস্নাত এই বাংলাদেশের মাটিতে নিয়ে আসার জোর চেষ্টা চলছে। বঙ্গভবনে কদিন আগে অনুষ্ঠিত পাবর্ত্য অঞ্চলের হেডম্যানদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নিজেই এ ব্যাপারে সবুজ সংকেত দিয়েছেন বলে খবর বেরিয়েছে। অথচ এই লোক তার সারাজীবনই বাংলাদেশকে ঘৃণা করে এসেছেন, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ তার কাছে ছিল শ্রেফ ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, পাকিস্তানে থেকেও নানাভাবে নানা কৌশলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত রাখতে ভূমিকা পালন করেছেন, মৃত্যুর পরও সেই লোকের স্থান কিভাবে হয় এই বাংলাদেশে? তবু সেটিই ঘটতে যাচ্ছে। রাষ্ট্রযন্ত্র ত্রিদিব রায়কে বরণের জন্য সবুজ সংকেত দিয়েছে ইতিমধ্যে। চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়ের পরিবার ঠিক এই মুহূর্তে ঢাকায়। বিশেষ মর্যাদায় এক দালালের লাশ নেওয়ার অপেক্ষায় তারা ক্ষণ গুণছে।
পাকিস্তানের এই দাসানুদাসকে বাংলাদেশের মাটিতে সমাহিত করার ইচ্ছাসংবলিত একটি আবেদন গত আট বছর ধরেই ঝুলছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। তাও সেটি ত্রিদিব রায়ের নিজের করা আবেদন ছিল না। বাংলাদেশের প্রতি এমনই ঘৃণা ছিল তার। পাকিস্তান সরকারকে লেখা তার একটি চিঠির অংশবিশেষ উল্লেখ করে পাকিস্তান হাইকমিশন থেকে ২০০৪ সালে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো বার্তায় ওই আবেদন করা হয়েছিল। পাকিস্তান সরকারও একাধিকবার এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানায় বাংলাদেশকে। মাঝখানে বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মোর্শেদ খান মানবিক বিবেচনায় নেওয়ার নির্দেশ দিলেও পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা স্পর্শকাতর ভেবে বিষয়টি নিয়ে আর এগোতে চাননি। সেই থেকে ঝুলছিল পাকিস্তান হাইকমিশনের আবেদন। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল যে আওয়ামী লীগ সরকার, তারাই বিনা বাক্যব্যয়ে, অনেকটা নিজেদের উদ্যোগে যুদ্ধাপরাধী ত্রিদিব রায়ের লাশ পাকিস্তান থেকে বরণ করে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত এখন। এই সরকারের লীলা বোঝা বড়ো কঠিন! ভোটের রাজনীতি বোঝা তার চেয়েও কঠিন। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে পাহাড়ি চাকমাদের মন জয় করাই কি সরকারের মূল উদ্দেশ্য, নাকি অন্য কিছু? অথচ বঙ্গভবনের সামনে যে মাঠ, তার নিচে যে মাটি, সেখানে কান পাতলেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুনতে পেতেন - যুদ্ধাপরাধী ত্রিদিব রায়কে গ্রহণ করার জন্য শহীদের রক্তে ভেজা এই মাটি প্রস্তুত নয়। পাকিস্তানের পরিত্যক্ত ওই জঞ্জাল এই মাটি চায় না।
হায় দুঃখিনী বাংলাদেশ!
রাঙামাটির বুড়িঘাটেই শুয়ে আছেন আমাদের বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আবদুর রউফ, সহযোদ্ধাদের জন্য নিরাপদ পথ তৈরি করে দিতে গিয়ে একাই লড়ে নিজে ঝাজরা হয়ে গিয়েছিলেন শত্রুর গুলিতে। সেই মাটিতেই বিশেষ মর্যাদায় সমাহিত হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী ৮ নম্বর দালাল! শুনেছি, রাঙামাটিতে রীতিমতো নাগরিক সংবর্ধনা কমিটি হয়েছে, গোপনে চলছে বিপুল আয়োজনের প্রস্তুতি। একাত্তরে যে লোকের ইশারায় পাকিস্তানি হানাদাররা শত শত মায়ের বুক খালি করেছে, দেশের পর দেশ ঘুরে যে লোক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে গেছেন, সেই কুলাঙ্গারের লাশ যখন শাহজালাল বিমানবন্দরের রানওয়েতে নামবে, বোবা কান্নায় একটু কি কেঁপে উঠবে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই দুঃখিনী বাংলাদেশ?
সংযুক্তি
● পাকিস্তানি পত্রিকায় ৮ নম্বর দালালের মৃত্যুসংবাদ
এসোসিয়েটেড প্রেস অব পাকিস্তান | ডেইলি ডন | পাকিস্তান অবজারভার
● পাকিস্তানে এক চাকমা রাজা : মূল প্রতিবেদন | অনুবাদ
● আদিবাসী রাজাকারদের কেন বিচার হবে না
● বাংলাদেশে সমাধি চান পাকিস্তানের 'উজির-এ-খামাখা'
● রাঙামাটিতে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা
● যেভাবে যুদ্ধাপরাধী হয়ে উঠলো রাজা ত্রিদিব রায়
প্রথম প্রকাশ : সামহোয়্যারইন ব্লগ
নেপথ্যে সেই একজন
এই সবকিছুর মূলে, সমস্ত ঘটনার নেপথ্যে কলকাঠি নেড়ে গেছেন একজন দালাল, একজন বিশ্বাসঘাতক, একজন যুদ্ধাপরাধী - চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়। নিজের আত্মজীবনী 'ডিপার্টেড মেলোডি'তে সেই ত্রিদিব রায়ের নিজের স্বীকারোক্তি এসেছে এভাবে- ১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল সকালে তিনি (রাজা ত্রিদিব রায়) তার ভগ্নিপতি কর্নেল হিউম, ম্যাজিস্ট্রেট মোনায়েম চৌধুরী, হজরত আলী এবং আরো কয়েকজন বাঙালি মুসলিম লীগ নেতাসহ চট্টগ্রামের নতুন পাড়ায় অবস্থিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেন্টারের পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেন। পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয় যে ম্যাজিস্ট্রেট মোনায়েম চৌধুরী এবং রাজা ত্রিদিব রায়ের সঙ্গে আসা আরো কয়েকজন বাঙালি ঢাকা থেকে আসা জুনিয়র অফিসারকে সঙ্গে করে কাপ্তাইয়ে যাবেন। ঠিক সেদিনই বিকেলে কাপ্তাই থেকে সেনাবাহিনীর একটি দল কয়েকটি লঞ্চ এবং স্পিডবোট নিয়ে রাঙামাটি আসে এবং বিনা প্রতিরোধে দখল করে নেয়।
যুদ্ধাপরাধী এক সাচ্চা পাকিস্তানির প্রতিকৃতি
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বেঁচে থাকলে বিস্মিত হতেন আজ। কারণ ত্রিদিব রায় তার চেয়েও সাচ্চা পাকিস্তানি হয়ে উঠেছিলেন। পাকিস্তানি হওয়া অপরাধ নয়, কিন্তু এই লোকের গায়ে যুদ্ধাপরাধের ঘনঘোর কালিমা লেগে ছিল আমৃত্যু। একাত্তরে এই লোক স্বজাতির সঙ্গে বেঈমানি করে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যায় প্রত্যক্ষ মদদ দিয়ে গেছেন। একাত্তরে রাঙামাটিতে যতো গণহত্যা চলেছে, সবগুলোর পেছনেই তার প্রত্যক্ষ মদদ ছিল। পরাজয় আঁচ করতে পেরে মুক্তিযুদ্ধের শেষ সময়ে তিনি পাকিস্তানে চলে যান। ওই সময়ে তাকে পাকিস্তান সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে শ্রীলংকা, বার্মা, থাইল্যান্ডসহ বৌদ্ধপ্রধান দেশগুলোতে পাঠানো হয় পাকিস্তানের পক্ষে সমর্থন আদায়ের জন্য। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহায়তার অভিযোগে দালাল আইনে অভিযুক্তদের একটি তালিকা প্রকাশ করা ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি, দৈনিক বাংলায়। ওই তালিকার ৮ নম্বরে রাজা ত্রিদিব রায়, আর ১২ নম্বরে গোলাম আযম! ১২ নম্বর দালাল তবু ষড়যন্ত্রের নতুন মিশন নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে এসেছিল, কিন্তু আট নম্বর দালাল ত্রিদিব রায় পাকিস্তানের পদসেবাতেই নিজেকে নিয়োগ করেছিলেন। খোদ পাকিস্তানের মানুষই তাকে বিদ্রুপ করে বলতো- উজির-ই-খামাখা। আজন্ম এই বিদ্রুপ মাথায় নিয়েও তিনি পেয়ারা পাকিস্তানের সেবা করে গেছেন। ১৯৭২ সালে ত্রিদিব রায়কে ফিরিয়ে আনার জন্য তার স্ত্রী বিনীত রায়কে পাকিস্তানে পাঠিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। তিনি ঘৃণাভরে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। পাকিস্তানের প্রতি এই আনুগত্যের স্বীকৃতি হিসেবে ওই সময়ের পাকি প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভূট্টো তার সম্মানে বিশেষ ভোজসভার আয়োজন করেছিলেন। পরে কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রিত্ব ছাড়াও ত্রিদিব রায় বিভিন্ন দেশে হয়েছেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত।
যুদ্ধাপরাধীকে বরণে সরকারের বিস্ময়কর আগ্রহ
এই গুণধর যুদ্ধাপরাধী ত্রিদিব রায়, যিনি বর্তমান চাকমা সার্কেলপ্রধান ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ের বাবা, গত ১৭ সেপ্টেম্বর ৭৯ বছর বয়সে মারা গেছেন তার স্বপ্নভূমি পাকিস্তানের ইসলামাবাদে। সেই পাকিস্তানি দালালের লাশ এখন ৩০ লাখ শহীদের রক্তস্নাত এই বাংলাদেশের মাটিতে নিয়ে আসার জোর চেষ্টা চলছে। বঙ্গভবনে কদিন আগে অনুষ্ঠিত পাবর্ত্য অঞ্চলের হেডম্যানদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নিজেই এ ব্যাপারে সবুজ সংকেত দিয়েছেন বলে খবর বেরিয়েছে। অথচ এই লোক তার সারাজীবনই বাংলাদেশকে ঘৃণা করে এসেছেন, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ তার কাছে ছিল শ্রেফ ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, পাকিস্তানে থেকেও নানাভাবে নানা কৌশলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত রাখতে ভূমিকা পালন করেছেন, মৃত্যুর পরও সেই লোকের স্থান কিভাবে হয় এই বাংলাদেশে? তবু সেটিই ঘটতে যাচ্ছে। রাষ্ট্রযন্ত্র ত্রিদিব রায়কে বরণের জন্য সবুজ সংকেত দিয়েছে ইতিমধ্যে। চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়ের পরিবার ঠিক এই মুহূর্তে ঢাকায়। বিশেষ মর্যাদায় এক দালালের লাশ নেওয়ার অপেক্ষায় তারা ক্ষণ গুণছে।
পাকিস্তানের এই দাসানুদাসকে বাংলাদেশের মাটিতে সমাহিত করার ইচ্ছাসংবলিত একটি আবেদন গত আট বছর ধরেই ঝুলছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। তাও সেটি ত্রিদিব রায়ের নিজের করা আবেদন ছিল না। বাংলাদেশের প্রতি এমনই ঘৃণা ছিল তার। পাকিস্তান সরকারকে লেখা তার একটি চিঠির অংশবিশেষ উল্লেখ করে পাকিস্তান হাইকমিশন থেকে ২০০৪ সালে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো বার্তায় ওই আবেদন করা হয়েছিল। পাকিস্তান সরকারও একাধিকবার এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানায় বাংলাদেশকে। মাঝখানে বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মোর্শেদ খান মানবিক বিবেচনায় নেওয়ার নির্দেশ দিলেও পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা স্পর্শকাতর ভেবে বিষয়টি নিয়ে আর এগোতে চাননি। সেই থেকে ঝুলছিল পাকিস্তান হাইকমিশনের আবেদন। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল যে আওয়ামী লীগ সরকার, তারাই বিনা বাক্যব্যয়ে, অনেকটা নিজেদের উদ্যোগে যুদ্ধাপরাধী ত্রিদিব রায়ের লাশ পাকিস্তান থেকে বরণ করে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত এখন। এই সরকারের লীলা বোঝা বড়ো কঠিন! ভোটের রাজনীতি বোঝা তার চেয়েও কঠিন। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে পাহাড়ি চাকমাদের মন জয় করাই কি সরকারের মূল উদ্দেশ্য, নাকি অন্য কিছু? অথচ বঙ্গভবনের সামনে যে মাঠ, তার নিচে যে মাটি, সেখানে কান পাতলেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুনতে পেতেন - যুদ্ধাপরাধী ত্রিদিব রায়কে গ্রহণ করার জন্য শহীদের রক্তে ভেজা এই মাটি প্রস্তুত নয়। পাকিস্তানের পরিত্যক্ত ওই জঞ্জাল এই মাটি চায় না।
হায় দুঃখিনী বাংলাদেশ!
রাঙামাটির বুড়িঘাটেই শুয়ে আছেন আমাদের বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আবদুর রউফ, সহযোদ্ধাদের জন্য নিরাপদ পথ তৈরি করে দিতে গিয়ে একাই লড়ে নিজে ঝাজরা হয়ে গিয়েছিলেন শত্রুর গুলিতে। সেই মাটিতেই বিশেষ মর্যাদায় সমাহিত হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী ৮ নম্বর দালাল! শুনেছি, রাঙামাটিতে রীতিমতো নাগরিক সংবর্ধনা কমিটি হয়েছে, গোপনে চলছে বিপুল আয়োজনের প্রস্তুতি। একাত্তরে যে লোকের ইশারায় পাকিস্তানি হানাদাররা শত শত মায়ের বুক খালি করেছে, দেশের পর দেশ ঘুরে যে লোক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে গেছেন, সেই কুলাঙ্গারের লাশ যখন শাহজালাল বিমানবন্দরের রানওয়েতে নামবে, বোবা কান্নায় একটু কি কেঁপে উঠবে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই দুঃখিনী বাংলাদেশ?
সংযুক্তি
● পাকিস্তানি পত্রিকায় ৮ নম্বর দালালের মৃত্যুসংবাদ
এসোসিয়েটেড প্রেস অব পাকিস্তান | ডেইলি ডন | পাকিস্তান অবজারভার
● পাকিস্তানে এক চাকমা রাজা : মূল প্রতিবেদন | অনুবাদ
● আদিবাসী রাজাকারদের কেন বিচার হবে না
● বাংলাদেশে সমাধি চান পাকিস্তানের 'উজির-এ-খামাখা'
● রাঙামাটিতে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা
● যেভাবে যুদ্ধাপরাধী হয়ে উঠলো রাজা ত্রিদিব রায়
প্রথম প্রকাশ : সামহোয়্যারইন ব্লগ
এক পাহাড়ি গেরিলার স্মৃতিচারণ "...আমাদের দলে গেরিলার সংখ্যা ৯০ জন। আমাদের যে স্বয়ংক্রিয় আধুনিক অস্ত্র ছিল, সবই সঙ্গে নিলাম। যেমন একে-৪৭ রাইফেল, চাইনিজ রাইফেল, এলএমজি, এসএমজি, কারবাইন প্রভৃতি। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম আর্মির গ্রুপে যতজনই থাক না কেন, প্রথম আক্রমণেই আমরা তাদের সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেব। আমরা একটা 'সুইটেবল' পজিশন নিলাম। অর্থাৎ মূল আক্রমণটা যেখান থেকে হবে সেটার পজিশন ঠিক করলাম। তারপর সামনে একটা গ্রুপ রাখলাম, যেটাকে বলা হয় 'ফ্রন্ট কাট অব পার্ট', একইভাবে পেছনে আর একটি 'রিয়ার কাট অব পার্ট' রাখলাম। এই দুটি শক্তিশালী গ্রুপকে রাখা হল আমাদের কাভারিং দেয়ার জন্য। সব আয়োজন সম্পন্ন হলো। এবার অপেক্ষার পালা। কখন আসবে মেজর মহসিন রেজার সেনাবাহিনী? একদিন, দুই দিন, তিন দিন...
এভাবে সাতদিন কেটে গেল। একই স্থানে থাকা খাওয়া ঘুমানো। আবার ভেতরে ভয় কখন চলে আসে সেনাবাহিনী। কোনো কিছুই ঠিক মতো করা যায় না। আর কতদিন এভাবে থাকতে হবে সেটাও বুঝতে পারছি না। এই যখন আমাদের অবস্থা ঠিক এরকম সময়েই চলে এলো সেনাবাহিনী। সেই সময় আমরা কিছুটা অপ্রস্তুতই বলা যায়। সাতদিনের দিন সকাল সাতটার দিকে হঠাৎ করেই দেখলাম মেজর মহসিন রেজার নেতৃত্বে ৪০ জনের মতো সেনাবাহিনী আমাদের অ্যামবুশ স্থানে চলে এসেছে। আমাদের মধ্যে কর্পোরাল শুক্র নামে একজন প্রচণ্ড সাহসী গেরিলা ছিল। সে ছিল এলএমজিম্যান। খুব ভালো ফাইটার। সে কারণে প্রথম ফায়ারের দায়িত্ব ছিল তার ওপর। পাহাড়ি পথ বেয়ে লাইন দিয়ে এগিয়ে আসছে সেনাবাহিনী। শুক্রর দিকে খেয়াল করলাম সে ফায়ারের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। একেবারে আমাদের রেঞ্জের মধ্যে চলে এল সেনাবাহিনী। কমান্ডারের নির্দেশে গর্জে উঠল শুক্রর এলএমজি। শুক্রর এলএমজির গুলিতে চার-পাঁচজন আর্মি লুটিয়ে পড়লো মাটিতে। তখন আমরা সবাই গুলি শুরু করেছি। পাল্টা গুলিবর্ষণ শুরু করেছে সেনাবাহিনীও। তুমুল গুলি বিনিময় হচ্ছে। সত্যিকার অর্থেই বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ। এক পর্যায়ে দেখলাম মেজর মহসিন রেজা সাত-আটজন সৈনিক নিয়ে মোটা গাছের আড়ালে পজিশন নিয়ে গুলিবর্ষণ শুরু করলো। আমরা বেশ সমস্যায় পড়ে গেলাম। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ গুলি বিনিময় হলো। তারপর আমাদের মধ্যে থেকে একজন গেরিলা 'অ্যামবুশ' অবস্থান থেকে সামনে এগিয়ে গেলেন। একেবারে ফিক্সড লাইন অর্থাৎ কোনো আড়াল ছাড়া সামনে গিয়ে অবস্থান নিলেন। তার হাতে ছিল কারবাইন। ব্রাশফায়ার করলেন। পঁচিশ রাউন্ড গুলি বেরিয়ে কারবাইনের ম্যাগাজিন খালি হয়ে গেল। মেজর মহসিন রেজাসহ সাত-আটজন সৈনিকের রক্তাক্ত দেহ পড়ে রইল মাটিতে। নিহত হলেন তারা সবাই। আধঘন্টার মতো যুদ্ধ চলল। সেনাবাহিনীর পুরো এক প্লাটুনের ৪০ জনের মতো সৈনিক নিহত হলেন। দুটি রকেট লাঞ্চার, মর্টার, এসএমজি, এলএমজি, একে-৪৭ রাইফেল, চাইনিজ রাইফেল প্রভৃতি প্রায় ৪০টি মতো আর্মির অস্ত্র দখল করলাম আমরা। এই প্রচুরসংখ্যক অস্ত্র নিয়ে আমরা বিজয়ীর বেশে ফিরে এলাম..."
(সূত্র : শান্তিবাহিনী ও গেরিলা জীবন/ গোলাম মোর্তোজা, সময় প্রকাশনী, ২০০২)
শান্তিবাহিনীর আরেক গেরিলা ও দীঘিনালা কলেজের সাবেক শিক্ষক বোজেন্দ্র প্রসাদ চাকমা ওরফে বিভাশের স্মৃতিচারণ- "আমি যখন চট্টগ্রাম কলেজে লেখাপড়া করছি সেই সময়ের একটি ঘটনা এখনো মনে আছে। শান্তিবাহিনীর একটি অ্যামবুশে সেনাবাহিনীর মেজর মহসিন রেজা নিহত হলেন। মহসিন রেজার স্ত্রীও তখন চট্টগ্রাম কলেজে পড়তেন। তার মৃত্যুর খবর এলো। হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন মহসিন রেজার স্ত্রী। সেই দৃশ্য এখনো আমার চোখে ভাসে।"
(সূত্র : প্রাগুক্ত)
(ডিসক্লেইমার : নিচের ঘটনাক্রম পুরোপুরি বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। প্রিয় ব্লগার, সুতরাং নিচের দিকের কিছুই পড়ার দরকার নেই আপনার, কারণ সেটা 'মানুষের' গল্প নয়, হতভাগা বাঙালির নিয়তি!)
ঘটনাক্রম (১৯৭৭-) : পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি ও সেনা হত্যা
৬ মে ১৯৭৭ : সাঙ্গু নদীতে কর্তব্যরত অবস্থায় আবদুল কাদিরসহ পাঁচ সেনাসদস্যকে হত্যা।
২৫ অক্টোবর ১৯৭৭ : বান্দরবানে নিহত হন নায়েক আবদুল গণি মিয়া, নায়েক আবদুস সাত্তার, নায়েক আরিফ, সিপাহী লুৎফর রহমান, সিপাহী আলী হোসেন এবং সিপাহী আবদুল খালেক মুন্সি।
২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ : সাঙ্গু নদীতে অ্যামবুশ, এক সেনাসদস্যকে হত্যা এবং প্রচুর গোলাবারুদ লুট।
৫ জুলাই ১৯৭৯ : কাপ্তাই নতুন বাজার থেকে ২ জন আনসার সদস্যকে অপহরণ করে হত্যা।
১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭৯ : দীঘিনালায় নায়েক এসএম রুহুল আমিনকে হত্যা।
১৪ অক্টোবর ১৯৭৯ : খাগড়াছড়িতে পাঁচ সেনাসদস্যকে হত্যা।
১৯ ডিসেম্বর ১৯৭৯, লংগদু : একই রাতে একযোগে কয়েকটি গ্রামে হামলা, ২০ অ-উপজাতীয়কে হত্যা, আহত ৪০, ১০৪টি বাড়ি অগ্নিদগ্ধ।
২৩ জানুয়ারি ১৯৮০ : খাগড়াছড়িতে তিন সেনাসদস্য খুন, আহত ৫।
২১ এপ্রিল ১৯৮০ : ফালাউংপাড়া নামের একটি স্থানে অ্যামবুশ করে ১১ রাইফেল ব্যাটালিয়নের ২০ জন জওয়ানকে হত্যা, প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র লুট।
১ মার্চ ১৯৮০ : ঘন্টিছড়া নামের একটি স্থানে অ্যামবুশ করে হত্যা করা হয় মেজর মহসিন আলমসহ ২২ জন সেনাসদস্যকে।
২৫ মার্চ ১৯৮০, কাউখালী : বাঙালি বসতিতে হামলা, দুই পক্ষে নিহত ২৯, আহত ১১ জন।
১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৮০, কাউখালী, বেতছড়ি ও কচুখালী : আকস্মিক আক্রমণে ৬ বাঙালি খুন, আহত ২৫ জন।
২৯ এপ্রিল ১৯৮৪ : খাগড়াছড়ি মাটিরাঙ্গায় বাঙালি বসতিতে গণহত্যা। হতাহতের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায়নি।
৩০ ও ৩১ মে ১৯৮৪, ভূষণছড়া ও বরকল : দিবাগত রাতে বাঙালি বসতিতে হামলা, ৮৮ জনকে গুলি করে হত্যা, আহত ৩৩ এবং ১৮ জন অপহৃত। আগুনে পুড়ে ছাই ২৬৪টি বাড়ি।
১৯ জুলাই ১৯৮৬ : খাগড়াছড়িতে এক সেনাসদস্য নিহত, আহত ৭।
২২ জুলাই ১৯৮৬, দীঘিনালা : সশস্ত্র হামলায় ২৪ বাঙালি খুন, ৩২ জনকে অপহরণ।
৭ আগস্ট ১৯৮৬ : ২ জন আনসার সদস্যকে অপহরণ করে হত্যা।
২১ জুন ১৯৮৭ : নাড়াইছড়ির অদূরে অ্যামবুশ, সেনাসদস্য আবদুর রাজ্জাক, ইসমাঈল হোসেন ও মোহনলালকে হত্যা।
২৪ নভেম্বর ১৯৮৭ : শিলছড়িতে দুই সেনাসদস্যকে গুলি করে হত্যা।
১৮ এপ্রিল ১৯৮৯, বাশখালী : পাহাড়ি-বাঙালি সংঘর্ষে ১৫ জনের মৃত্যু।
২৭ জানুয়ারি ১৯৮৯ : বন কর্মকর্তা আবুল হোসেন, বজল আহমদ ও মাহবুবুল আলমকে অপহরণ করে হত্যা।
৪ মে ১৯৮৯, লংগদু : আকস্মিক আক্রমণে ১৫ বাঙালির মৃত্যু।
১৬ এপ্রিল ১৯৯০, নাইক্ষ্যংছড়ি ও বলিপাড়া : ১৯ বাঙালিকে গুলি করে হত্যা। এ বছরই থানচিতে ১১ জন সেনা জওয়ানকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়।
১০ জানুয়ারি ১৯৯২, খিরাম : খিরাম বন কার্যালয়ে আক্রমণ, ৬ কর্মচারীকে হত্যা।
২ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২, লংগদু : চলন্ত লঞ্চে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ১৭ বাঙালিকে হত্যা।
২৯ জুন ১৯৯২ : মহালছড়ি-রাঙ্গামাটি সড়কে পাহারা চৌকির ওপর হামলা, দুজন সেনা সদস্য নিহত।
১৪ জুন ১৯৯৫ : শান্তিবাহিনীর ২০ সদস্যের একটি গ্রুপের হাতে ব্যাংক লুট। গার্ডকে হত্যা এবং দুই ব্যাংক কর্মচারীকে অপহরণ।
৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬, পাকুয়াখালী (রাঙামাটি) : নৃশংস হামলা চালিয়ে ৩৫ জন নিরস্ত্র বাঙালি কাঠুরিয়াকে হত্যা।
ভালো থেকো কল্পনা চাকমা, ভালো থেকো মেজর মহসিন রেজা, ভালো থেকো ধান, ভাটিয়ালী গান, ভালো থেকো...
এভাবে সাতদিন কেটে গেল। একই স্থানে থাকা খাওয়া ঘুমানো। আবার ভেতরে ভয় কখন চলে আসে সেনাবাহিনী। কোনো কিছুই ঠিক মতো করা যায় না। আর কতদিন এভাবে থাকতে হবে সেটাও বুঝতে পারছি না। এই যখন আমাদের অবস্থা ঠিক এরকম সময়েই চলে এলো সেনাবাহিনী। সেই সময় আমরা কিছুটা অপ্রস্তুতই বলা যায়। সাতদিনের দিন সকাল সাতটার দিকে হঠাৎ করেই দেখলাম মেজর মহসিন রেজার নেতৃত্বে ৪০ জনের মতো সেনাবাহিনী আমাদের অ্যামবুশ স্থানে চলে এসেছে। আমাদের মধ্যে কর্পোরাল শুক্র নামে একজন প্রচণ্ড সাহসী গেরিলা ছিল। সে ছিল এলএমজিম্যান। খুব ভালো ফাইটার। সে কারণে প্রথম ফায়ারের দায়িত্ব ছিল তার ওপর। পাহাড়ি পথ বেয়ে লাইন দিয়ে এগিয়ে আসছে সেনাবাহিনী। শুক্রর দিকে খেয়াল করলাম সে ফায়ারের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। একেবারে আমাদের রেঞ্জের মধ্যে চলে এল সেনাবাহিনী। কমান্ডারের নির্দেশে গর্জে উঠল শুক্রর এলএমজি। শুক্রর এলএমজির গুলিতে চার-পাঁচজন আর্মি লুটিয়ে পড়লো মাটিতে। তখন আমরা সবাই গুলি শুরু করেছি। পাল্টা গুলিবর্ষণ শুরু করেছে সেনাবাহিনীও। তুমুল গুলি বিনিময় হচ্ছে। সত্যিকার অর্থেই বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ। এক পর্যায়ে দেখলাম মেজর মহসিন রেজা সাত-আটজন সৈনিক নিয়ে মোটা গাছের আড়ালে পজিশন নিয়ে গুলিবর্ষণ শুরু করলো। আমরা বেশ সমস্যায় পড়ে গেলাম। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ গুলি বিনিময় হলো। তারপর আমাদের মধ্যে থেকে একজন গেরিলা 'অ্যামবুশ' অবস্থান থেকে সামনে এগিয়ে গেলেন। একেবারে ফিক্সড লাইন অর্থাৎ কোনো আড়াল ছাড়া সামনে গিয়ে অবস্থান নিলেন। তার হাতে ছিল কারবাইন। ব্রাশফায়ার করলেন। পঁচিশ রাউন্ড গুলি বেরিয়ে কারবাইনের ম্যাগাজিন খালি হয়ে গেল। মেজর মহসিন রেজাসহ সাত-আটজন সৈনিকের রক্তাক্ত দেহ পড়ে রইল মাটিতে। নিহত হলেন তারা সবাই। আধঘন্টার মতো যুদ্ধ চলল। সেনাবাহিনীর পুরো এক প্লাটুনের ৪০ জনের মতো সৈনিক নিহত হলেন। দুটি রকেট লাঞ্চার, মর্টার, এসএমজি, এলএমজি, একে-৪৭ রাইফেল, চাইনিজ রাইফেল প্রভৃতি প্রায় ৪০টি মতো আর্মির অস্ত্র দখল করলাম আমরা। এই প্রচুরসংখ্যক অস্ত্র নিয়ে আমরা বিজয়ীর বেশে ফিরে এলাম..."
(সূত্র : শান্তিবাহিনী ও গেরিলা জীবন/ গোলাম মোর্তোজা, সময় প্রকাশনী, ২০০২)
শান্তিবাহিনীর আরেক গেরিলা ও দীঘিনালা কলেজের সাবেক শিক্ষক বোজেন্দ্র প্রসাদ চাকমা ওরফে বিভাশের স্মৃতিচারণ- "আমি যখন চট্টগ্রাম কলেজে লেখাপড়া করছি সেই সময়ের একটি ঘটনা এখনো মনে আছে। শান্তিবাহিনীর একটি অ্যামবুশে সেনাবাহিনীর মেজর মহসিন রেজা নিহত হলেন। মহসিন রেজার স্ত্রীও তখন চট্টগ্রাম কলেজে পড়তেন। তার মৃত্যুর খবর এলো। হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন মহসিন রেজার স্ত্রী। সেই দৃশ্য এখনো আমার চোখে ভাসে।"
(সূত্র : প্রাগুক্ত)
(ডিসক্লেইমার : নিচের ঘটনাক্রম পুরোপুরি বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। প্রিয় ব্লগার, সুতরাং নিচের দিকের কিছুই পড়ার দরকার নেই আপনার, কারণ সেটা 'মানুষের' গল্প নয়, হতভাগা বাঙালির নিয়তি!)
ঘটনাক্রম (১৯৭৭-) : পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি ও সেনা হত্যা
৬ মে ১৯৭৭ : সাঙ্গু নদীতে কর্তব্যরত অবস্থায় আবদুল কাদিরসহ পাঁচ সেনাসদস্যকে হত্যা।
২৫ অক্টোবর ১৯৭৭ : বান্দরবানে নিহত হন নায়েক আবদুল গণি মিয়া, নায়েক আবদুস সাত্তার, নায়েক আরিফ, সিপাহী লুৎফর রহমান, সিপাহী আলী হোসেন এবং সিপাহী আবদুল খালেক মুন্সি।
২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ : সাঙ্গু নদীতে অ্যামবুশ, এক সেনাসদস্যকে হত্যা এবং প্রচুর গোলাবারুদ লুট।
৫ জুলাই ১৯৭৯ : কাপ্তাই নতুন বাজার থেকে ২ জন আনসার সদস্যকে অপহরণ করে হত্যা।
১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭৯ : দীঘিনালায় নায়েক এসএম রুহুল আমিনকে হত্যা।
১৪ অক্টোবর ১৯৭৯ : খাগড়াছড়িতে পাঁচ সেনাসদস্যকে হত্যা।
১৯ ডিসেম্বর ১৯৭৯, লংগদু : একই রাতে একযোগে কয়েকটি গ্রামে হামলা, ২০ অ-উপজাতীয়কে হত্যা, আহত ৪০, ১০৪টি বাড়ি অগ্নিদগ্ধ।
২৩ জানুয়ারি ১৯৮০ : খাগড়াছড়িতে তিন সেনাসদস্য খুন, আহত ৫।
২১ এপ্রিল ১৯৮০ : ফালাউংপাড়া নামের একটি স্থানে অ্যামবুশ করে ১১ রাইফেল ব্যাটালিয়নের ২০ জন জওয়ানকে হত্যা, প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র লুট।
১ মার্চ ১৯৮০ : ঘন্টিছড়া নামের একটি স্থানে অ্যামবুশ করে হত্যা করা হয় মেজর মহসিন আলমসহ ২২ জন সেনাসদস্যকে।
২৫ মার্চ ১৯৮০, কাউখালী : বাঙালি বসতিতে হামলা, দুই পক্ষে নিহত ২৯, আহত ১১ জন।
১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৮০, কাউখালী, বেতছড়ি ও কচুখালী : আকস্মিক আক্রমণে ৬ বাঙালি খুন, আহত ২৫ জন।
২৯ এপ্রিল ১৯৮৪ : খাগড়াছড়ি মাটিরাঙ্গায় বাঙালি বসতিতে গণহত্যা। হতাহতের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায়নি।
৩০ ও ৩১ মে ১৯৮৪, ভূষণছড়া ও বরকল : দিবাগত রাতে বাঙালি বসতিতে হামলা, ৮৮ জনকে গুলি করে হত্যা, আহত ৩৩ এবং ১৮ জন অপহৃত। আগুনে পুড়ে ছাই ২৬৪টি বাড়ি।
১৯ জুলাই ১৯৮৬ : খাগড়াছড়িতে এক সেনাসদস্য নিহত, আহত ৭।
২২ জুলাই ১৯৮৬, দীঘিনালা : সশস্ত্র হামলায় ২৪ বাঙালি খুন, ৩২ জনকে অপহরণ।
৭ আগস্ট ১৯৮৬ : ২ জন আনসার সদস্যকে অপহরণ করে হত্যা।
২১ জুন ১৯৮৭ : নাড়াইছড়ির অদূরে অ্যামবুশ, সেনাসদস্য আবদুর রাজ্জাক, ইসমাঈল হোসেন ও মোহনলালকে হত্যা।
২৪ নভেম্বর ১৯৮৭ : শিলছড়িতে দুই সেনাসদস্যকে গুলি করে হত্যা।
১৮ এপ্রিল ১৯৮৯, বাশখালী : পাহাড়ি-বাঙালি সংঘর্ষে ১৫ জনের মৃত্যু।
২৭ জানুয়ারি ১৯৮৯ : বন কর্মকর্তা আবুল হোসেন, বজল আহমদ ও মাহবুবুল আলমকে অপহরণ করে হত্যা।
৪ মে ১৯৮৯, লংগদু : আকস্মিক আক্রমণে ১৫ বাঙালির মৃত্যু।
১৬ এপ্রিল ১৯৯০, নাইক্ষ্যংছড়ি ও বলিপাড়া : ১৯ বাঙালিকে গুলি করে হত্যা। এ বছরই থানচিতে ১১ জন সেনা জওয়ানকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়।
১০ জানুয়ারি ১৯৯২, খিরাম : খিরাম বন কার্যালয়ে আক্রমণ, ৬ কর্মচারীকে হত্যা।
২ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২, লংগদু : চলন্ত লঞ্চে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ১৭ বাঙালিকে হত্যা।
২৯ জুন ১৯৯২ : মহালছড়ি-রাঙ্গামাটি সড়কে পাহারা চৌকির ওপর হামলা, দুজন সেনা সদস্য নিহত।
১৪ জুন ১৯৯৫ : শান্তিবাহিনীর ২০ সদস্যের একটি গ্রুপের হাতে ব্যাংক লুট। গার্ডকে হত্যা এবং দুই ব্যাংক কর্মচারীকে অপহরণ।
৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬, পাকুয়াখালী (রাঙামাটি) : নৃশংস হামলা চালিয়ে ৩৫ জন নিরস্ত্র বাঙালি কাঠুরিয়াকে হত্যা।
ভালো থেকো কল্পনা চাকমা, ভালো থেকো মেজর মহসিন রেজা, ভালো থেকো ধান, ভাটিয়ালী গান, ভালো থেকো...
লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): cht, chittagong hill tracts, hill tracts, kalpana chakma, major mohsin reza, shantibahini, Guerrilla warfare, bangladesh army, pakuakhali, rangamati, khagrachari, bandarban ;
প্রথম প্রকাশ
ছবিটির দিকে তাকিয়ে দেখুন ভালো করে। প্ল্যাকার্ডগুলো পড়তে পারছেন? মাত্র তিন মাস আগে তোলা ছবি, জাপানে। আপনি কি মনে করতে পারেন, তিন মাস আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম কি অশান্ত ছিল কিংবা কোনো রকম সংঘাতের ঘটনা কি ঘটেছিল? মনে করতে পারবেন না। কিন্তু লক্ষ্য করুন, একটি চক্র তখনও, খুব পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ ও সেনাবাহিনীবিরোধী প্রচারণায় সক্রিয়। তাও দেশে নয়, বহু দূরের দেশ জাপানে। নিশ্চিত থাকুন, এই ছবি অনতিবিলম্বে পৌঁছে গেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন সংস্থার কাছে। এভাবে, বিশ্বের নানা প্রান্তে, আপনার অজান্তেই প্রিয় স্বদেশ ধর্ষিত হয়ে যাচ্ছে কিছু কুলাঙ্গারের হাতে। আমরা সেই খবর রাখি না। রাখতেও বোধহয় চাই না। বরং আত্মপীড়নেই যতো সুখ আমাদের!ফলে এটা স্বাভাবিক যে, দৃকবাসী শহিদুল আলমরা পশ্চিমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ফেরি করে বেড়াবেন। বাংলাদেশী সাইট আনহিয়ার্ড ভয়েসেস ইংরেজি ভাষায় সযত্নে একপেশে ধারাবিবরণী তুলে ধরবে পশ্চিমাদের জন্য। বাঙালি সেটেলারের জামার ভেতরে তারা রামদা খুঁজে ফিরবে মরিয়া হয়ে। তানভীর মোকাম্মেলরা জাপানি ভাষার সাইটে পায়ের ওপর পা তুলে বাংলাদেশের গোষ্ঠী উদ্ধারে মগ্ন তো হতেই পারেন। মানবাধিকারের সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তি তারা! তাদের কথা থাক, বরং দৃষ্টি ফেরানো যাক অন্যদিকে। দেশী ও প্রবাসী উপজাতীয়দের পরিচালিত কমপক্ষে ১৫টি ওয়েবসাইট এবং অন্তত ১০টি বিদেশী সংস্থা সরাসরি বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। সরকার ছাড়াও তাদের প্রধান লক্ষ্য বাঙালি জনগোষ্ঠী এবং সেনাবাহিনী। সন্দেহ নেই, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আসুন, দেখা যাক কারা কিভাবে বাংলাদেশবিরোধী প্রপাগাণ্ডা চালিয়ে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে-
জুম্মনেট অর্গ
এটি প্রধানত জাপানি ভাষায় নির্মিত সাইট। তবে এর একটি ক্ষুদ্র ইংরেজি সংস্করণও আছে। মূল সাইটটি গুগল ট্রান্সলেশনের সহায়তা নিয়ে দেখলে এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছুটা আঁচ করা যায়। সাইটটির বেশকিছু স্পর্শকাতর অংশ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। জুম্মনেট অর্গকে আমরা বলতে পারি, বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণার সবচেয়ে নিকৃষ্ট উদাহরণ।
জুম্ম পিপলস নেটওয়ার্ক ইউকে
ব্রিটেনভিত্তিক আরেকটি প্রপাগাণ্ডা সাইট- http://www.jpnuk.org.uk/
২০০২ সাল থেকে এই সাইটটি বাংলাদেশ বিরোধী প্রপাগাণ্ডা চালিয়ে আসছে। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে, যা তারা নিজেরাই জানিয়েছে- পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতি আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিশ্বনেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ। সাইটটির নিচের দিকে-বাঁয়ে সর্বশেষ লিংকটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক- Jihadist Terrorism in Bangladesh!
সিএইচটি গ্লোবাল ভয়েসেস
জুম্মনেটের আরেকটি প্রপাগান্ডা সাইট হচ্ছে সিএইচটি গ্লোবাল ভয়েসেস। তাদের বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণার মরিয়া রূপটি দেখতে পাবেন এখানে আর প্রপাগাণ্ডা পাবেন এখানে। জাপানি ভাষায়ও সিএইচটি গ্লোবাল ভয়েসেসের আরেকটি প্রপাগাণ্ডা সাইট আছে। জাপানভিত্তিক সিএইচটি কমিটির রহস্যজনক কার্যক্রম দেখতে পাবেন এখানে।
সাম্প্রদায়িকতা ও বিদ্বেষ ছড়ানোর অপচেষ্টা
শান্তিচুক্তির পরও থেমে নেই বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা। একদশক আগের তথ্য ও ছবিই এই প্রচারণার সম্বল। আছে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর চেষ্টাও। এই সাইটে তেমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই 'ধর্মীয় নিগ্রহের' জন্য দায়ী করা হয়েছে মুসলিম ধর্মাবলম্বী এবং সেনাবাহিনীকে। আছে বাঙালিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা, পশ্চিমা সুযোগসন্ধানীদের মায়াকান্না, এমনকি বিদেশী সাহায্য নিয়ে কুৎসিত প্রচারণাও। এখানে পাবেন হিল ট্রাক্টস মনিটরের ছদ্মাবরণে
দেশবিরোধী প্রপাগাণ্ডা (পিডিএফ), উপজাতীয়দের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও জাতিসংঘ প্রধানের কাছে পাঠানো চিঠির নমুনা।
এশিয়ান অ্যাফেয়ার্স
হংকংভিত্তিক 'থিংক ট্যাঙ্ক' এশিয়ান অ্যাফেয়ার্স তাদের ভাষ্যমতে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে তথ্য-সেতুবন্ধন তৈরির কাজ করছে। তারা মূলত বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সামরিক-বেসামরিক ভাবনাকেন্দ্রগুলোর (থিঙ্ক ট্যাঙ্ক) নজর রাখে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রভাবিত করার চেষ্টাও করে থাকে। বাংলাদেশবিরোধী জনমত সংগঠনে এশিয়ান অ্যাফেয়ার্সের ভূমিকা একেবারে হেলাফেলার নয়। সাইটটি সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। এর গ্রাহক হতে হলে ফি দিতে হয় বার্ষিক ২৫ ইউরো।
একচক্ষু ইউএনপিও
ইউএনপিও নামের আরেকটি সংগঠন বিশ্বজুড়ে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সদা সোচ্চার। তবে সেটা বেছে বেছে। আমি পুরো সাইট সার্চ করে ফিলিস্তিন নিয়ে একটি লাইন দেখলাম না। তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে তাদের একপেশে রিপোর্ট যথারীতি আছেই।
হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস
বিশ্বজুড়ে ছড়ানো হিউম্যান রাইটস কংগ্রেসের প্রচারণা দেখুন, কী ভীষণ সাম্প্রদায়িক এবং একপেশে! একনজর দেখুন বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণার লক্ষ্য কারা।
সংঘবদ্ধ প্রচারণা সর্বত্র
এশিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটসের ছদ্মাবরণে বাঙালিদের বিরুদ্ধে কুৎসিত সাম্প্রদায়িক প্রচারণা দেখুন এখানে (পিডিএফ)। লন্ডনভিত্তিক সারভাইভাল ইন্টারন্যাশনালের একপেশে প্রচারণা পাবেন এখানে। বাঘাইছড়ির ঘটনা নিয়ে পশ্চিমাদের প্রকাশিত সংবাদের মূলভাবটি লক্ষ্য করুন। আর ভালো কথা, জুম্মল্যান্ড নামের 'দেশটি' কি আপনারা কেউ চেনেন? এই দেশটি কোথায়, একটু জানাবেন কেউ?
সংযুক্তি
খাগড়াছড়ি থেকে একজন সেনা কর্মকর্তা কর্তৃক তার উদ্বিগ্ন সহকর্মীদের কাছে পাঠানো ইমেইল পড়ুন এই পোস্টের ২৭ নম্বর মন্তব্যে।
লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): cht, chittagong hill tracts, hill tracts, jummanet, jummaland, shantibahini, Guerrilla warfare, bangladesh army, rangamati, khagrachari, bandarban ;
প্রথম প্রকাশ
নশ্বর এই পৃথিবীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক যে কোনো রচনাই শুরু হয় ধরাবাঁধা ১৯০০ সাল থেকে, ঐতিহাসিক চিউয়িংগাম টেনে টেনে। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মাহাত্ম্য ঘুরে সেই রচনা খানিকটা দম নেয় কংগ্রেসী আন্দোলনে এসে। তারপর নানান ইতিহাসের চিপাগলি বেয়ে একাত্তর সালটাকে একটু পাশ কাটিয়ে সোজা জনসংহতি সমিতির অন্দরমহলে! রচনার শেষের লাইনটি প্রায়ই এইরকম হতাশা দিয়ে শেষ হয়- "অতঃপর উহারা কি আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের সুযোগ হইতে বঞ্চিত হইবে?" যতো ভারি ভারি নিরর্থক শব্দ, কারণে-অকারণে যতো বেশি কান্নাকাটি - পার্বত্য রচনাও ততো হিট। মোট কথা, রচনা বা ইতিহাস এমনভাবে লিখতে হয়, পাঠক যেন কোনোমতেই কিছু বুঝে উঠতে না পারে। সেনা প্রত্যাহার থেকে ভূমি বন্টনসহ যাবতীয় সমস্যার সমাধান দিতে হবে একলাইনে!আমরা মূর্খ মানুষ, অতো শতো বুঝি না, ভাষার মারপ্যাঁচ অতো জানি না। তবে আর্মি ক্যাম্পের সামনে বাস থামিয়ে ট্রাইবাল মহিলার গালে সেনাসদস্যের অকারণ চড় দেখেছি, উর্দিপরা মানুষের নৃশংসতা দেখেছি। আবার সাধারণ মানুষের ওপর শান্তিবাহিনীর নারকীয়তাও দেখেছি। আমি অনেক কাছ থেকে মিশে দেখেছি, বেশিরভাগ পাহাড়িই মূলত সরল। এখনো দিনেদুপুরে মানুষ খুন হয়, এমন জায়গায় গিয়ে পাহাড়ি পরিবারের অকাতর ভালোবাসা পেয়েছি। পাহাড়ের বাঙালিদেরও কাছ থেকে দেখেছি - হারামির হারামি! তাদের নিঃশ্বাসে কেবলই বিদ্বেষের বিষবাষ্প দেখেছি- বহুবার, বহুভাবে। লংগদুতে গর্ভবতী মহিলার পেট চিরে কিভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছিল- হাসিমুখে সেই গল্প শুনেছিয়েছিলেন পরিচিত এক বাঙালি।
পাহাড়িদের নেতা সন্তু লারমা সংগ্রামী মানুষ, হুমকিপ্রিয়ও, কথায় কথায় সশস্ত্র সংগ্রামের ভয় দেখাতে ভালোবাসেন। আজ বুধবার রাঙামাটির সমাবেশে সন্তু লারমা হুঁশিয়ারি দিলেন, ইউপিডিএফকে নিষিদ্ধ করা না হলে আবারো তারা পার্বত্য অঞ্চলে নতুন করে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করবেন। এজন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন সমস্যা সৃষ্টি হলে তার জন্য সরকারকে দায় নিতে হবে বলেও তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন।
ইউপিডিএফের যারা সমর্থক, তাদের সকলেই পাহাড়ি। তারাও একসময় জনসংহতির সমিতির অংশ ছিল। কে না জানে, শূন্য থেকে ইউপিডিএফ আজ রীতিমতো জনপ্রিয় সংগঠনে রূপান্তরিত হয়েছে। তাও মূলত সন্তু লারমাদেরই অবদান। এই এখনো সন্তু লারমা কিংবা রূপায়ন দেওয়ানদের চাঁদা না দিয়ে খুব কম ভাগ্যবানেরই সুযোগ আছে পার্বত্য চট্টগ্রামে (বিশেষ করে রাঙামাটিতে) কিছু করা - হোক সে সাহায্য সংস্থার কাজ কিংবা ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্য। সেই খবরও আমাদের অজানা নয়। ঠিকাছে, চাঁদাবাজি নেই কোথায়! একআধটু চলছে, চলুক না ভেবে পাশ কাটিয়ে যাই। কিন্তু সন্তু লারমার আজকের হুঁশিয়ারি, তার ভাষা, তার হুমকিটা ভালো লাগল না মোটেই। এটা অগ্রহণযোগ্য ও অবমাননাকর। সশস্ত্র আন্দোলনের হুমকি তো রাষ্ট্রদোহিতার পর্যায়েই পড়ে বলে শুনেছি!
ছবি : বাংলার চোখ
লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): chittagong hill tracts, rangamati, khagrachari, bandarban, cht, hill tract, santu larma, jss, updf, chittagong, পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, বান্দরবন, সন্তু লারমা, ইউপিডিএফ, জেএসএস, জনসংহতি সমিতি, চট্টগ্রাম, চিটাগাং ;
প্রথম প্রকাশ
০১.
পাঁচ বছর আগের কথা। সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের তত্ত্বাবধানে দীঘিনালা-মারিশ্যা সড়কের কাজ মাত্রই শুরু হয়েছে। কাসালং ব্রিজের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে সবে। তথাকথিত 'পরিদর্শনে' গিয়েছিলাম আমরা কয়েকজন। এইসবের কিছুই নয়- আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল সেই 'নিষিদ্ধ এলাকা'- সাজেক! দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সেবার বাঘাইছড়ির মারিশ্যার পর আর বেশিদূর এগোতে পারিনি। ওপরের দুটি ছবি পাঁচ বছরের আগের। হার্ডডিস্ক থেকে খুঁজে পেতে বের করলাম।

০২.
পাঁচ বছরের মাথায় সাজেকের হাতছানি আর এড়ানো গেল না। এর মধ্যে কত জল কাসালংয়ের নিচ দিয়ে গড়িয়ে গেছে। কতো কী ঘটে গেছে। আমাদের ছয় সদস্যবিশিষ্ট দলটির লক্ষ্য, সাজেক! সবার মনে একটা অ্যাডভেঞ্চার অ্যাডভেঞ্চার ভাব। আমাদের এক সঙ্গীর জন্ম বাঘাইছড়িতে। অথচ সে-ই কিনা তার উপজেলার একটি ইউনিয়ন সাজেকে যায়নি!
খাগড়াছড়ি হয়ে বাঘাইছড়িতে নামি। সেখানে জেলা পরিষদের রেস্ট হাউস খালিই ছিল। কিন্তু ইউএনও থাকার অনুমতি দিতে গাইগুই করেন। পরে স্থানীয় প্রেসক্লাবের তৎপরতায় থাকার অনুমতি মেলে। ওপরতলায় সর্বডানের কক্ষে আমার জন্য বরাদ্দ হল।
দুপুরে বাঘাইছড়ি সদরে সাজেক ইউপির চেয়ারম্যান এলতেঙ্গা কথা দিয়েছিলেন, আমাদের সঙ্গে যাবেন। উপযাচক হয়ে সন্ধ্যায় বিডিআর ব্যাটালিয়নে যাই দিকনির্দেশনা নিতে। কর্তব্যরত মেজর জানালেন এলতেঙ্গার কাছ থেকে তিনি আমাদের কথা শুনেছেন। তিনি আশ্বাস দিলেন, সাজেক ক্যাম্পে বলে দেবেন। তবে বারবার সাবধান করে দিলেন, রুইলুই পাড়ার পর এক পাও না আগাতে। পরদিন সকালে দেখি এলতেঙ্গা বেঁকে বসেছেন- তার নাকি কী এক সমস্যা আছে। তবে বললেন, পরেরবার আসলে তিনি নাচগানের আয়োজন করবেন। অগত্যা কী আর করা!
পরদিন সকালে বাঘাইহাট থেকে একটি জিপ ভাড়া করি। সাজেকে যাওয়া-আসার ভাড়া তিন হাজার টাকা। তাও যেই সেই জিপ না, রীতিমতো ডাবল ইঞ্জিন।

০৩.
সেই গাড়ি চলছে তো চলছেই। হৃৎপিন্ডই নড়ে উঠে, এমন ঝাঁকুনি। এবড়োথেবড়ো পাহাড়ি রাস্তা। ভয়ংকর খাড়া পথ বেয়ে ওঠানামা। চলতিপথে বহুবার এমন দেখেছি- গাড়ি নামছে, কিন্তু ঢালু সেই পথের শেষটা চোখে দেখা যায় না। ভয়াবহ সব বাঁকের কথা সবল হৃৎপিন্ডের অধিকারী লোককেও ভয় পাইয়ে দেবে নিশ্চিত।
চুলচেরা হিসাব করে দেখিনি ঠিক, তবে পথে পথে গাড়ি থামিয়ে কমপক্ষে ২০টি সেনাক্যাম্পে হাজিরা দিতে হয়েছে। প্রতিটিতেই অপেক্ষা করছিল দুর্ভোগ। কেন যাচ্ছি, কতোক্ষণ থাকবো- সবখানেই একই জিজ্ঞাসা। সবখানেই অসহ্য প্রতীক্ষা।
যাওয়ার পথে দুইছড়ির আগে একটা সেনাক্যাম্পের সামনে সব গাড়ি থেমে গেল। যাত্রীরা একে একে বের হয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে গেল। যেন এটাই নিয়ম! ক্যামেরাটা নিয়ে আমি একটা ছাউনিতে দাঁড়িয়ে ক্যামেরা তাক করলাম। সামনে সবুজে ছাওয়া পাহাড় আর পাহাড়।

০৪.
কাসালং ব্রিজের আগে ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটালিয়নের একটা বড়ো ক্যাম্পে এসে চতুর্থবারের মতো বাধাপ্রাপ্ত হই। এবারের বাধাটা বেশ কঠিন- সামনে যেতে দেবে না কিছুতেই। প্রখর রোদে গাড়িতে বসতেও দিল না আমাদের কাউকেই। বিরক্তি লাগছিল প্রচন্ড। সাহস করে নেমকার্ড দিলাম একজনের হাতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক পড়ল- একটু আশার আলো। ভেতরে গিয়ে অন্য দৃশ্য। দায়িত্বপ্রাপ্ত তরুণ মেজর সাদরে অভ্যর্থনা জানালেন। বললেন, পথে পথে দেখবেন আমাদের লোকজন সড়কের কাজ করছে। বহু হিসাবনিকাশ দিলেন, একটি মানচিত্রও দেখালেন- সেখানে কী কাজ তারা করছেন। আমি বিস্মিত হওয়ার ভান করে যাই আগাগোড়া- আসাধারণ কাজ আপনাদের! মেজর পুরো বিগলিত। আবার ছুটল গাড়ি।

০৫.
জনমানবহীন এবং অস্বাভাবিক নিরব এই পথে এক অপ্রীতিকর ঘটনার মুখোমুখি হলাম হঠাৎই। পাহাড় কেটে মাটি সমান করছিল একটি ট্রাক্টর, চালক এক সেনাসদস্য। ক্যামেরা বের করতেই পাশের ঘন জঙ্গলের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল চার মূর্তি- হাতে রাইফেল। অন্য অস্ত্রও হতে পারে, অতো নিচ থেকে খেয়াল করার উপায় নেই। নির্দেশমতো আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমরা সবাই। নানা জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আগের ক্যাম্পের মেজর সাহেবের রেফারেন্স দিয়ে ছাড়া পেলাম। সাজেক তখনো অনেক দূর।

বিডিআরের কড়া নজরদারি এড়িয়ে কিভাবে কিভাবে যেন রুইলুইপাড়ার পথে এগিয়ে গেল আমাদের গাড়ি। কিছুদূর এগোতেই হঠাৎ পাহাড়ের নিচ থেকে বেরিয়ে এল দুই তরুণী। সঙ্গে শুকনো হলুদের বোঝা। তাদেরকে তুলে নিই আমাদের গাড়িতে।
সামনে উঁচু পাহাড়ের ওপর কমলাকপাড়া...
প্রথম প্রকাশ | দ্বিতীয় প্রকাশ
পাঁচ বছর আগের কথা। সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের তত্ত্বাবধানে দীঘিনালা-মারিশ্যা সড়কের কাজ মাত্রই শুরু হয়েছে। কাসালং ব্রিজের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে সবে। তথাকথিত 'পরিদর্শনে' গিয়েছিলাম আমরা কয়েকজন। এইসবের কিছুই নয়- আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল সেই 'নিষিদ্ধ এলাকা'- সাজেক! দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সেবার বাঘাইছড়ির মারিশ্যার পর আর বেশিদূর এগোতে পারিনি। ওপরের দুটি ছবি পাঁচ বছরের আগের। হার্ডডিস্ক থেকে খুঁজে পেতে বের করলাম।

০২.
পাঁচ বছরের মাথায় সাজেকের হাতছানি আর এড়ানো গেল না। এর মধ্যে কত জল কাসালংয়ের নিচ দিয়ে গড়িয়ে গেছে। কতো কী ঘটে গেছে। আমাদের ছয় সদস্যবিশিষ্ট দলটির লক্ষ্য, সাজেক! সবার মনে একটা অ্যাডভেঞ্চার অ্যাডভেঞ্চার ভাব। আমাদের এক সঙ্গীর জন্ম বাঘাইছড়িতে। অথচ সে-ই কিনা তার উপজেলার একটি ইউনিয়ন সাজেকে যায়নি!
খাগড়াছড়ি হয়ে বাঘাইছড়িতে নামি। সেখানে জেলা পরিষদের রেস্ট হাউস খালিই ছিল। কিন্তু ইউএনও থাকার অনুমতি দিতে গাইগুই করেন। পরে স্থানীয় প্রেসক্লাবের তৎপরতায় থাকার অনুমতি মেলে। ওপরতলায় সর্বডানের কক্ষে আমার জন্য বরাদ্দ হল।
দুপুরে বাঘাইছড়ি সদরে সাজেক ইউপির চেয়ারম্যান এলতেঙ্গা কথা দিয়েছিলেন, আমাদের সঙ্গে যাবেন। উপযাচক হয়ে সন্ধ্যায় বিডিআর ব্যাটালিয়নে যাই দিকনির্দেশনা নিতে। কর্তব্যরত মেজর জানালেন এলতেঙ্গার কাছ থেকে তিনি আমাদের কথা শুনেছেন। তিনি আশ্বাস দিলেন, সাজেক ক্যাম্পে বলে দেবেন। তবে বারবার সাবধান করে দিলেন, রুইলুই পাড়ার পর এক পাও না আগাতে। পরদিন সকালে দেখি এলতেঙ্গা বেঁকে বসেছেন- তার নাকি কী এক সমস্যা আছে। তবে বললেন, পরেরবার আসলে তিনি নাচগানের আয়োজন করবেন। অগত্যা কী আর করা!
পরদিন সকালে বাঘাইহাট থেকে একটি জিপ ভাড়া করি। সাজেকে যাওয়া-আসার ভাড়া তিন হাজার টাকা। তাও যেই সেই জিপ না, রীতিমতো ডাবল ইঞ্জিন।

০৩.
সেই গাড়ি চলছে তো চলছেই। হৃৎপিন্ডই নড়ে উঠে, এমন ঝাঁকুনি। এবড়োথেবড়ো পাহাড়ি রাস্তা। ভয়ংকর খাড়া পথ বেয়ে ওঠানামা। চলতিপথে বহুবার এমন দেখেছি- গাড়ি নামছে, কিন্তু ঢালু সেই পথের শেষটা চোখে দেখা যায় না। ভয়াবহ সব বাঁকের কথা সবল হৃৎপিন্ডের অধিকারী লোককেও ভয় পাইয়ে দেবে নিশ্চিত।
চুলচেরা হিসাব করে দেখিনি ঠিক, তবে পথে পথে গাড়ি থামিয়ে কমপক্ষে ২০টি সেনাক্যাম্পে হাজিরা দিতে হয়েছে। প্রতিটিতেই অপেক্ষা করছিল দুর্ভোগ। কেন যাচ্ছি, কতোক্ষণ থাকবো- সবখানেই একই জিজ্ঞাসা। সবখানেই অসহ্য প্রতীক্ষা।
যাওয়ার পথে দুইছড়ির আগে একটা সেনাক্যাম্পের সামনে সব গাড়ি থেমে গেল। যাত্রীরা একে একে বের হয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে গেল। যেন এটাই নিয়ম! ক্যামেরাটা নিয়ে আমি একটা ছাউনিতে দাঁড়িয়ে ক্যামেরা তাক করলাম। সামনে সবুজে ছাওয়া পাহাড় আর পাহাড়।

০৪.
কাসালং ব্রিজের আগে ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটালিয়নের একটা বড়ো ক্যাম্পে এসে চতুর্থবারের মতো বাধাপ্রাপ্ত হই। এবারের বাধাটা বেশ কঠিন- সামনে যেতে দেবে না কিছুতেই। প্রখর রোদে গাড়িতে বসতেও দিল না আমাদের কাউকেই। বিরক্তি লাগছিল প্রচন্ড। সাহস করে নেমকার্ড দিলাম একজনের হাতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক পড়ল- একটু আশার আলো। ভেতরে গিয়ে অন্য দৃশ্য। দায়িত্বপ্রাপ্ত তরুণ মেজর সাদরে অভ্যর্থনা জানালেন। বললেন, পথে পথে দেখবেন আমাদের লোকজন সড়কের কাজ করছে। বহু হিসাবনিকাশ দিলেন, একটি মানচিত্রও দেখালেন- সেখানে কী কাজ তারা করছেন। আমি বিস্মিত হওয়ার ভান করে যাই আগাগোড়া- আসাধারণ কাজ আপনাদের! মেজর পুরো বিগলিত। আবার ছুটল গাড়ি।

০৫.
জনমানবহীন এবং অস্বাভাবিক নিরব এই পথে এক অপ্রীতিকর ঘটনার মুখোমুখি হলাম হঠাৎই। পাহাড় কেটে মাটি সমান করছিল একটি ট্রাক্টর, চালক এক সেনাসদস্য। ক্যামেরা বের করতেই পাশের ঘন জঙ্গলের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল চার মূর্তি- হাতে রাইফেল। অন্য অস্ত্রও হতে পারে, অতো নিচ থেকে খেয়াল করার উপায় নেই। নির্দেশমতো আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমরা সবাই। নানা জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আগের ক্যাম্পের মেজর সাহেবের রেফারেন্স দিয়ে ছাড়া পেলাম। সাজেক তখনো অনেক দূর।

বিডিআরের কড়া নজরদারি এড়িয়ে কিভাবে কিভাবে যেন রুইলুইপাড়ার পথে এগিয়ে গেল আমাদের গাড়ি। কিছুদূর এগোতেই হঠাৎ পাহাড়ের নিচ থেকে বেরিয়ে এল দুই তরুণী। সঙ্গে শুকনো হলুদের বোঝা। তাদেরকে তুলে নিই আমাদের গাড়িতে।
সামনে উঁচু পাহাড়ের ওপর কমলাকপাড়া...
প্রথম প্রকাশ | দ্বিতীয় প্রকাশ



