ইন্টারনেটকে শেকল পরানোর এই সরকারি অপচেষ্টা রুখতে হবে যে কোনো মূল্যে

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর বুধবার ::
● গত ১২ সেপ্টেম্বর তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত 'অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা' নিয়ে মতামত দানের জন্য নির্ধারিত ১০ দিনের মধ্যে সাতদিন পার হয়েছে। মূলধারার গণমাধ্যমের পাশাপাশি অনলাইন গণমাধ্যমগুলো ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তবে বিডিনিউজ চক্র নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পর পরই যে কোনো মূল্যে এই নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় আগবাড়িয়ে তারা তথ্য সচিবের একটি সাক্ষাৎকারও প্রকাশ করেছে। ব্লগারদের বিভ্রান্ত করার জন্য ওই চক্রটির এ হল ভিন্ন কৌশল - বলছেন আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট অনেকেই। এর বাইরেও বিডিনিউজ ব্লগে কর্তৃপক্ষীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নীতিমালার পক্ষে সাফাই গাওয়া হচ্ছে।
● অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা নিয়ে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করতে যাচ্ছে অনলাইন নিউজ পোর্টাল উন্মোচনডটকম। রাজধানীর পুরানা পল্টনের মুক্তি ভবনের প্রগতি মিলনায়তনে বিকেল চারটায় এ বৈঠক শুরু হবে। বৈঠকে আগ্রহী যে কেউ অংশ নিতে পারবেন। এ বিষয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করুন: [সালমান তারেক শাকিল, ০১১-৯৮-৩৬৪৪৯২]।
● ব্লগারদের একাংশের উদ্যোগে আগামী ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ছয়টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মাঠে একটি পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হবে। প্রয়োজনে যোগাযোগ : ০১৭১৪৫৫১৯৩৭ ও ০১৬১১৮২৪৭৪২।
● ইতিমধ্যে ফেসবুকে তৈরি হয়েছে দুটি গ্রুপ - অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা ২০১২ : আপনার মত কী? এবং অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা- আন্দোলন
--------------------------------


কখনোই যা ঘটবে না এমন চিন্তা করে একবার ফেসবুক নিয়ে খানিকটা রসিকতা করেছিলাম। কী পোড়া কপাল! একটু ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ঠিক সেই ফেসবুক-কাণ্ডই বাস্তবে রূপ দিল খোদ বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়।
না ছিল কারো দাবি, না ছিল কারো আবেদন কিংবা অনুরোধ - দিনের পর দিন প্রায় ঘুমিয়ে কাটানো অকর্মণ্য তথ্য মন্ত্রণালয় দিনকয়েক আগে হঠাৎই উদ্যোগী হয়ে উঠল অনলাইন গণমাধ্যমের পরিচালনা নীতিমালা তৈরি নিয়ে। গত ১২ সেপ্টেম্বর জনাকয়েককে ডেকে রীতিমতো বৈঠকে বসলেন তথ্যসচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন। কাউকে কাউকে খসড়ার অনুলিপি দিয়ে ১০ দিনের মধ্যে মতামত দিতে বলা হয়েছে। কারণ আগামী মাসেই চূড়ান্ত করা হবে নীতিমালা। সেই নীতিমালার খসড়া ইতিমধ্যে নানা মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। যারাই সেটি দেখছেন, তারাই একবাক্যে বলছেন অনলাইনের জন্য এর চেয়ে হাস্যকর নীতিমালা আর কিছুই হতে পারে না। এর আগে সরকারের প্রিয় শব্দাবলী ব্যবহার করে এর আগে ঠিক একইভাবে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালার একটি খসড়া তৈরি হয়েছিল। কিন্তু গণমাধ্যম কর্মীদের তীব্র বিরোধিতার মুখে সেই নীতিমালা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। খোদ তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিও বলেছিলেন, ‘গণমাধ্যমের জন্য হুমকি হবে, এমন কোনো নীতিমালা চাই না।’ সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলে বলে মুখে ফেনা তুলছে, অথচ তারাই ডিজিটাল মাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরার আয়োজন করছে - এর চেয়ে বড়ো পরিহাস আর কী হতে পারে! পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশেই অনলাইন গণমাধ্যমের জন্য এইরকম আজগুবি নীতিমালা নেই।

অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা : হাইলাইটস
এই নীতিমালা “অনলাইন গণমাধ্যম পরিচালনা নীতিমালা ২০১২” নামে অভিহিত হবে।
● প্রয়োজনীয় তথ্যাবলী (অফিস অবকাঠামো, মোট জনবল ও নির্ধারিত ব্যাংক ব্যালেন্স, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র, সাংবাদিকতায় অভিজ্ঞতার সনদপত্র)সহ যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে।
● অনলাইন গণমাধ্যম স্থাপনের জন্য আবেদনকারী ব্যক্তিকে বাংলাদেশের নাগরিক এবং কোম্পানীকে অবশ্যই বাংলাদেশী কোম্পানী হতে হবে।
● এই নীতিমালার অধীনে প্রদেয় লাইসেন্স ব্যতিরেকে কোন প্রতিষ্ঠান অনলাইন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা কিংবা পরিচালনা করতে পারবে না;
● আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে আবেদনের সাথে ফেরতযোগ্য আর্নেস্টমানি বাবদ সচিব, তথ্য মন্ত্রণালয় বরাবরে ২,০০,০০০/- (দুই লক্ষ) টাকার ব্যাংক ড্রাফট/পে-অর্ডার প্রদান করতে হবে;
● সরকার কর্তৃক নির্বাচিত আবেদনকারীদের অনুকূলে লাইসেন্স প্রদানের পর বিটিআরসির নিকট থেকে অনুমোদন গ্রহণ করতে হবে:
● লাইসেন্স গ্রহণকালে আবেদনকারী এককালীন ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা তথ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কোডে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জমা প্রদান করে মূল কপি মন্ত্রণালয়ে দাখিল করবে।
● প্রতি বছরে সংশ্লিষ্ট খাতে ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার) টাকা ফি প্রদান করে লাইসেন্স নবায়ন করতে হবে। সরকার প্রয়োজনে লাইসেন্স ফি পুন:নির্ধারণ করতে পারবে;
● লাইসেন্স-এর মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ৩০ (ত্রিশ) দিন পূর্বে নবায়নের জন্য আবেদন করতে হবে এবং বিশেষ কারণে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নবায়ন করতে ব্যর্থ হলে ৫,০০০/- (পাঁচ হাজার) টাকা সারচার্জ জমা দিয়ে সর্বোচ্চ ০২ মাসের মধ্যে লাইসেন্স নবায়ন করতে হবে;
● লাইসেন্স গ্রহণকালে অনুমতিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পূর্বে প্রদত্ত আর্নেস্টমানি বাবদ ২,০০,০০০/- (দুই লক্ষ) টাকা পরবর্তীতে জামানত হিসেবে গণ্য হবে;
● অনলাইন পত্রিকার ক্ষেত্রে পত্রিকার প্রতিটি কপিতে প্রকাশক ও সম্পাদকের নাম ঠিকানা অবশ্যই উল্লেখ থাকতে হবে;
● অনলাইন পত্রিকার ক্ষেত্রে পরিচালনাকারীর ন্যূনতম ৫,০০,০০০/- (পাঁচ লক্ষ) টাকা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ২,০০,০০০/- (দুই লক্ষ) টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স থাকতে হবে;
● সকল অনলাইন গণমাধ্যম বাংলাদেশে স্থাপিত সার্ভারে হোস্টিং করতে হবে। ডিএন এস আই (ডোমেইন নেইম সার্ভার ইন্টারনেট প্রটোকল) সম্পর্কে তথ্য মন্ত্রণালয় অবহিত থাকতে হবে।
● অনলাইন গণমাধ্যমের অন্য কোন দেশি বা বিদেশী গণমাধ্যম লিংক করা যাবে না।
● সম্প্রচারিত বিষয়সমূহের রেকর্ড (কনটেন্ট) ৯০ (নব্বই) দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হবে;
● বিজ্ঞাপন প্রচার সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানসহ প্রতিদিনের মোট প্রচার সময়ের ২০% এর বেশী হবে না।
● অনলাইন গণমাধ্যম দেশী-বিদেশী ধারণকৃত অনুষ্ঠান প্রচার করতে পারবে। তবে সরকার কর্তৃক অনুমোদিত সেন্সর নীতিমালা সম্পূর্ণভাবে অনুসৃত হবে। কোন অবস্থাতেই বিদেশী অনলাইন গণমাধ্যম সংবাদ, সংবাদ পর্যালোচনা, টক-শো; আলোচনা, সম্পাদকীয় এবং সমসাময়িক ঘটনাবলি নিয়ে অনুষ্ঠান ও মন্তব্য সরাসরি সম্প্রচার বা ধারণকৃত বা যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত অনুষ্ঠান প্রচার করা যাবে না।
● মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণ, একযোগে বিনামূল্যে সম্প্রচার করতে হবে। সরকার ঘোষিত বিভিন্ন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ দিবসের সংবাদ/অনুষ্ঠানাদি যথাযথ গুরুত্ব সহকারে প্রচার করতে হবে। দেশের জরুরি জাতীয় প্রয়োজনে বা জনস্বার্থে প্রচারের জন্য সরকার যখন যে রকম নির্দেশ প্রদান করবে, তা যথাযথভাবে পালনপূর্বক প্রচার করতে হবে।
● সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে সরকারের নীতিমালা প্রতিফলনসহ বিনামূল্যে সরকারি প্রেস নোট, বিজ্ঞপ্তি ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
● নিম্নলিখিত সংবাদ/অনুষ্ঠানাদি সম্প্রচার করা যাবে না:
(ট) বন্ধুপ্রতিম দেশসমূহের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বিষয়ে ক্ষতিকর কিছু রয়েছে এমন কোনো সংবাদ/অনুষ্ঠান;
● বার্ষিক ফি: লাইসেন্স প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অনলাইন প্রচারিত বিজ্ঞাপন বাবদ প্রাপ্ত মোট অর্থের শতকরা ২ ভাগ সরকারি কোষাগারে সংশ্লিষ্ট খাতে চালানের মাধ্যমে প্রতি অর্থ বছর শেষ হওয়ার ৪ (চার) মাসের মধ্যে জমা প্রদান করতে হবে।
● বর্তমানে বিদ্যমান অনলাইন গণমাধ্যমের কোন টেলিভিশন, বেতার এবং সংবাদ পত্রকে এই নীতিমালা কার্যকর হওয়ার পর অনধিক ১২০ (একশত বিশ) দিনের মধ্যে এই নীতিমালার আওতায় লাইসেন্স করতে হবে।
● নীতিমালার খসড়ার পুরোটা পাবেন এখানে

নীতিমালা, নাকি চাঁদাবাজির ডিজিটাল স্টাইল?
অনলাইন গণমাধ্যম ব্যাপারটা যে আসলে কী, সে সম্পর্কেই মাথামোটা আমলাদের কোনো ধারণাই নেই। এই অজ্ঞতা ঢাকতে তারা কমিউনিটি রেডিও সংক্রান্ত নীতিমালার প্রায় পুরোটাই কপি করে অনলাইন গণমাধ্যমের নীতিমালা তৈরি করেছেন। প্রস্তাবিত নীতিমালার এই একটা লাইনেই তাদের মূর্খতা প্রায় পুরোটাই বেরিয়ে পড়েছে - ‌'১১. (ঘ) অনলাইন পত্রিকার ক্ষেত্রে পত্রিকার প্রতিটি কপিতে প্রকাশক ও সম্পাদকের নাম ঠিকানা অবশ্যই উল্লেখ থাকতে হবে!' এ যেন মাংস রন্ধনের প্রণালী অনুসরণ করে শরবত বানানোর চেষ্টা। এতোটা মূর্খ কী করে হন একজন সচিব কিংবা তার অধস্থনরা? সরকারিভাবে যে নীতিমালার ভিত্তিতে ঠিকাদার কিংবা আসবাবপত্র সরবরাহকারী নিয়োগ করা হয়, অনলাইন গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও তথ্য মন্ত্রণালয় প্রায় একই নীতিমালা তৈরি করেছে।
লাইসেন্স পাওয়ার জন্য এককালীন পাঁচ লাখ টাকা তথ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে হাস্যকর সেই নীতিমালায়। প্রতিবছর নবায়ন ফি দিতে হবে ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু কেন দিতে হবে - তার কোনো যুক্তি নেই। সরকার কি অনলাইন গণমাধ্যমগুলোতে বিজ্ঞাপন হিসেবে টেন্ডারগুলো দেবে, নাকি মাসিক ভর্তুকি দেবে? নাকি ডোমেইন-হোস্টিংয়ের মাসিক ফি বহন করবে? কোনোটিই যেখানে নয়, সেখানে ঠিক কী কারণে তথ্য মন্ত্রণালয়কে এককালীন পাঁচ লাখ আর প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে? নাকি সরকারি চাঁদাবাজির এ কোনো ডিজিটাল স্টাইল?

মূর্খতার ধারাপাত
অনলাইন গণমাধ্যম এখন পর্যন্ত 'ঘরের খেয়ে পরের মোষ চড়ানো' ছাড়া আর কিছুই নয়। আগামী অন্তত ২০ বছরে এর ব্যতিক্রম কিছু ঘটার সম্ভাবনাও কম। খোদ খালিদীর বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরই কর্মরত সাংবাদিকদের বেতন-ভাতাই দিতে পারে না। কাকতালীয়ভাবে আজই জাতীয় সংসদে অভিযোগ করা হয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানটি এসএমএসের মাধ্যমে প্রতারণা করছে। ওদিকে বাংলানিউজকে বিজ্ঞাপন সংগ্রহের জন্য করতে হচ্ছে রীতিমতো 'চাঁদাবাজি' ও ব্ল্যাকমেইলিং। টিকে থাকার এই যখন অবস্থা, সেখানে বিকাশমান অনলাইন গণমাধ্যমের ওপর হয়রানিমূলক নিয়ন্ত্রণ আরোপের একটিই কারণ থাকতে পারে, সেটি হচ্ছে মুক্ত গণমাধ্যমকে সরকারি শেকল পরিয়ে 'পোষা' বানানো। আমার মাথায় আসে না, দেশের বাইরে যাদের ডোমেইন-হোস্টিং, তাদের ক্ষেত্রে সরকারের কী করার আছে, আঙ্গুল চোষা ছাড়া? কেউ যদি চান, দেশের বাইরে থেকে তিনি একটি অনলাইন পত্রিকা চালাবেন, সেক্ষেত্রে সরকারের করার কী আছে? কোনো অনলাইন পত্রিকা যদি লন্ডন কি নিউইয়র্ক, কোপেনহেগেন কি টরন্টো থেকে কথিত লাইসেন্স ছাড়াই প্রকাশিত হয় - সেটি নিয়ে সরকারের করণীয় কিছু আছে কি? বছরদুয়েক আগে সরকার দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের হাস্যকর অভিযোগে পুরো ফেসবুকই ব্লক করে হাস্যরসের পাত্র হয়েছিল। কদিন পর আবার খুলে দিতেও বাধ্য হয়েছে। খুলতেই হবে। কারণ ফেসবুককে নিয়ে সরকারের কিছুই করার নেই। ফেসবুক নিজেই আরেক 'সরকার'!
কাকতালীয়ভাবে ঠিক আজকেই (১৭ সেপ্টেম্বর) আপত্তিকর ছবির ট্রেলার প্রচারের অভিযোগে পুরো ইউটিউবই বন্ধ করে দেওয়ার কিছু সময় পর আবার খুলেও দেওয়া হয়।
এমনকি মুদ্রিত সংবাদপত্রের নীতিমালাও অনলাইন পত্রিকার সঙ্গে মিলবে না। দুটোর চরিত্র অনেকটাই আলাদা। প্রকৃতপক্ষে গুরুতর সাইবার অপরাধ দমন ছাড়া ইন্টারনেটে সরকারের করণীয় কিংবা খবরদারি করার কিছুই নেই। তথ্যসচিব কি জানেন ডিক্লারেশন নিয়ে, লাইসেন্স ফি দিয়ে, সরকার মহাশয়ের সহৃদয় অনুমতি নিয়ে দুনিয়ার কোথায়-কবে কোন্ অনলাইন পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়েছে?


কালো নীতিমালার নেপথ্যে কারা?
একাধিক উৎস থেকে জেনেছি, অনলাইন গণমাধ্যম নিয়ে হাস্যকর এই নীতিমালা তৈরির পেছনে মূল তদবির করেছেন দুজন ব্যক্তি - বেবী মওদুদ এবং তৌফিক ইমরোজ খালিদী। বেবী মওদুদ খোদ প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বান্ধবী, সংরক্ষিত কোটায় নির্বাচিত সাংসদ এবং অনলাইন পত্রিকা বিডিনিউজের সোশ্যাল এফেয়ার্স এডিটর। আর দ্বিতীয়জন সেই অনলাইন পত্রিকার সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী। গত ১২ সেপ্টেম্বর তথ্য মন্ত্রণালয় আয়োজিত বৈঠকে অংশগ্রহণকারী একাধিক ব্যক্তি এর সত্যতা নিশ্চিত করে বলেছেন, কেবল নিজেদের প্রতিষ্ঠানের প্রভাব অক্ষুণ্ন রাখতে তারা অনলাইন গণমাধ্যমের রাশ টেনে ধরতে চাইছেন। মন্ত্রণালয়ের অনাগ্রহ সত্ত্বেও তারা নিয়ন্ত্রণমূলক নীতিমালা তৈরির জন্য বারবার তদবির এবং ক্ষেত্রবিশেষে চাপ প্রয়োগ করেছেন। অনেকেরই হয়তো মনে থাকবে, বিভিন্ন সময়ে এই দুজন ব্যক্তি ব্লগসহ অনলাইন গণমাধ্যম নিয়ে বিষোদগারে মেতেছেন।
গত ডিসেম্বরে এক অনুষ্ঠানে তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেন, "যে কেউ একটি সংবাদ মাধ্যমের (টেলিভিশন চ্যানেল, সংবাদপত্র ইত্যাদি) মালিক হয়ে যাবে, এটা হতে পারে না। সেই সঙ্গে মোবাইল ফোনে যে কেউ সংবাদ সেবা দেবে, এটাও হতে পারে না। কোনো নিয়ামকের ভিত্তিতে এটা করতে হবে। এ জন্য একটি নীতিমালা প্রয়োজন।" “১০০টি টেলিভিশন চ্যানেলও হতে পারে, তবে সবাইকেই যে খবর প্রচার করতে হবে, তার কোনো মানে নেই। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নীতি-নির্ধারকদেরই এ বিষয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে,” বলেন তিনি। মুক্ত মত প্রকাশের প্রসঙ্গ ধরে ব্লগিংয়ের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি সবিনয়ে বলতে চাই, মত প্রকাশের নামে যা ইচ্ছা তাই প্রকাশের আমি বিরোধিতা করি। মত প্রকাশ করতে হবে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে। আমি এখানে বলতে চাই, পুরোপুরি স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের যে কথাটি বিভিন্ন ব্লগাররা বলতে চান, তার সঙ্গে আমার ভিন্নমত রয়েছে। মত প্রকাশের সম্পূর্ণ স্বাধীনতার স্বপ্ন একটি বিভ্রম এবং কোনো সমাজেই যে এর নজির নেই, অনেকের এই ভাবনার সঙ্গে আমিও একমত পোষণ করি।"
গত মার্চে জাতীয় সংসদেও ব্লগসহ সোশ্যাল মিডিয়াগুলো নিয়ে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সাংসদ ও বিডিনিউজের সোশ্যাল স্যোশাল অ্যাফেয়ার্স এডিটর বেবী মওদুদ বলেন, 'ফেইসবুকসহ নানা ব্লগে গুজব ছাড়াও মনের মাধুরী মিশিয়ে প্রচারণা চলে।'

পরবর্তী টার্গেট ব্লগ?
আগে থেকেই ভয় ছিল, রেডিও-টিভির পর সরকার খুব দ্রুতই ইন্টারনেটের দিকে পা বাড়াবে। অনলাইন গণমাধ্যম নিয়ে সরকারের অহেতুক উদ্যোগ সেটিই স্পষ্ট করে তুলেছে। এখানে শঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে যে, কালো এই নীতিমালা যদি কোনোভাবে বাস্তবায়িত হয়ে যায়, তাহলে পরবর্তী টার্গেট অবধারিতভাবেই ব্লগ ও ব্লগাররা। এখনই অনেকে বলছেন যে, অনলাইন গণমাধ্যমের আওতায় ব্লগগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা কেবলই সময়ের ব্যাপার। এমনকি প্রস্তাবিত এই নীতিমালার আওতায় ব্লগে স্বাধীন মতামত প্রকাশের দায়ে অভিযুক্ত হতে পারেন যেকোনো ব্যক্তিই। মাথামোটা আমলারা যদি ইচ্ছে করে, তাহলে ব্লগস্পট কিংবা ওয়ার্ডপ্রেসে থাকা আপনার ব্যক্তিগত ব্লগটিকেও এই নীতিমালার আওতায় নিয়ে আসতে পারে। যদিও ঠিক আজকেই তথ্য সচিব হেদায়তুল্লাহ আল মামুন বলেছেন, প্রস্তাবিত ইন্টারনেট সংবাদ মাধ্যম নীতিমালার আওতায় সোশ্যাল মিডিয়া বা ব্লগ নিয়ন্ত্রণের কোনো ইচ্ছা সরকারের নেই। কিন্তু একা তার কথায় আশ্বস্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই। সাম্প্রতিক অনেক ইস্যুতেই ব্লগারদের প্রতিক্রিয়া সরকারের শীর্ষমহলে উষ্মা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে সরকারের উচ্চ পর্যায়েও ব্লগকে ভালো চোখে দেখা হয় না। সরকার চাইবেই ব্লগের পায়ে শেকল পরানোর জন্য।

ইন্টারনেটকে শেকল পরানো যাবে না
সবমিলিয়ে মুক্ত গণমাধ্যমকে শেকল পরানোর এই নীতিমালা যদি কোনোভাবে বাস্তবায়িত হয়ে যায়, তাহলে প্রথমত মুক্তমত প্রকাশের স্বাধীনতা বিঘ্নিত হবে। সরকারের সমালোচনা যারা করবেন, নানা কৌশলে তাদের হয়রানি করার একটি পথ তৈরি হবে। এই এখনো মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা আছে একটিই - ইন্টারনেট। একে শেকল পরানোর যে কোনো অপচেষ্টা রুখতে হবে। এরপরও যদি হয়েই যায়, তথ্য মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় স্বার্থান্বেষী মহলের এই অপচেষ্টা 'ডিজিটাল বাংলাদেশের' সবচেয়ে কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

সংযুক্তি
নীতিমালার খসড়া : প্রতিষ্ঠানের জন্য লাইসেন্স নিতে হবে
অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা ‘ডিজিটাল বাংলাদেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক
অনলাইন সংবাদমাধ্যমে নীতিমালা আসছে
অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা অক্টোবরে
অনলাইন সংবাদপত্র : নীতিমালার প্রয়োজন নেই
‘অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা’ অগণতান্ত্রিক
‘ভয়তু’ অনলাইন পত্রিকা
নীতিমালায় হ্যাঁ, আইনি ভীতিমালায় না
ডিজিটাল বাংলাদেশবিরোধী নীতিমালা কার স্বার্থে?
সম্পাদকীয় : অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা ডিজিটাল সংস্কৃতির পরিপন্থি
ডিজিটাল সাংবাদিকতা আর পাঁচলক্ষ টাকার লাইসেন্স
এই উদ্যোগ সফল হওয়ার সুযোগ নেই
নীতিমালার উদ্দেশ্য সোশ্যাল মিডিয়া-ব্লগ নিয়ন্ত্রণ নয় : তথ্যসচিব
অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা নয়

Tags: , , ,

About author

ফিউশন ফাইভ। ব্লগ লিখছেন পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে।

0 মন্তব্য

Leave a Reply