গুগলই সম্ভবত নিজেদের কাজের স্বচ্ছতা রাখতে ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট
প্রকাশের সাহস দেখিয়েছিল প্রথম। কবে কোন্ দেশের সরকার ও সংস্থা বিশেষ কোনো
তথ্য মোছা কিংবা বিশেষ কোনো ইউজারের ব্যক্তিগত তথ্য জানতে চেয়ে গুগলের
কাছে অনুরোধ পাঠিয়েছে, তার সবই বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা আছে সেই
ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্টে। এই ধারায় গত বছর থেকে টুইটারও ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট
প্রকাশ করা শুরু করে। এর বাইরে নিশ্চয়ই আরো কেউ না কেউ প্রকাশ করে থাকতে
পারে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো সামাজিক গণমাধ্যমের মধ্যে সামহোয়্যারইন...
ব্লগই সম্ভবত প্রথম ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট
প্রকাশ করলো। ইংরেজিতে প্রকাশিত সেই রিপোর্টের সারসংক্ষেপ বাংলায় তুলে ধরা
হল এখানে। তাতে দেখা যায়, ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ
থেকে সামহোয়্যারইন... ব্লগ কর্তৃপক্ষের কাছে ব্লগারদের বিভিন্ন পোস্ট মোছার
অনুরোধ এসেছে চারবার। মানহানির অভিযোগে মোট ২৮টি পোস্ট মুছে ফেলার অনুরোধ
জানানো হয় সরকারি দলের পক্ষ থেকে। এর মধ্যে অভিযোগের ভিত্তি থাকায় ১১টি
পোস্ট মোছা হয়, বাকি ১৭টি পোস্ট বহাল থাকে। অন্যদিকে ২০০৯ সাল থেকে এ যাবত
আমারব্লগ কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে মন্তব্য মোছা, পোস্ট মোছা ছাড়াও একজন
ব্লগারের একাউন্ট ব্লক করে দেওয়ার দাবি জানিয়ে মেইল করে সামহোয়্যারইন
কর্তৃপক্ষের কাছে।
পরবর্তীতে প্রয়োজন অনুসারে এই ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট হালনাগাদ করা হবে।
মে ২০০৯
মানহানির কারণ দেখিয়ে আমারব্লগ ডট কমের পক্ষ থেকে সামহোয়্যারইনে প্রকাশিত তিনটি মন্তব্য মুছে দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : কোনো মন্তব্য মোছা হয়নি।
আগস্ট ২০১০
আমারব্লগ ডট কমের সহযোগী প্রতিষ্ঠান [link|http://e-bangladesh.org|]ই-বাংলাদেশ ডট অর্গ কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগে সামহোয়্যারইনে প্রকাশিত একটি ছবি মুছে দেওয়ার অনুরোধ জানায়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : ওই ছবিটি মুছে দেওয়া হয়।
জানুয়ারি ২০১১
কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগে marions-kochbuch.de নামের একটি ওয়েবসাইট সামহোয়্যারইনে প্রকাশিত একটি ছবি মুছে দেওয়ার অনুরোধ জানায়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : ওই ছবিটি মুছে দেওয়া হয়।
আগস্ট ২০১১
আবারও সেই marions-kochbuch.de! কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগে ওই ওয়েবসাইটটি সামহোয়্যারইনে প্রকাশিত একটি ছবি মুছে দেওয়ার অনুরোধ জানায়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : ওই ছবিটি মুছে দেওয়া হয়।
এপ্রিল ২০১১
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সামহোয়্যারইনে প্রকাশিত মোট ১০টি 'মানহানিকর' পোস্ট মুছে দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : মোট ৮টি পোস্ট মোছা হয়, অভিযোগের ভিত্তি না থাকায় বাকি ২টি পোস্ট বহাল থাকে।
মে ২০১১
এক মাস মাথায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আবারও সামহোয়্যারইনে প্রকাশিত মোট ১৮টি 'মানহানিকর' পোস্ট মুছে দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : মোট ৩টি পোস্ট মোছা হয়, অভিযোগের ভিত্তি না থাকায় বাকি ১৫টি পোস্ট বহাল থাকে।
জুলাই ২০১১
মানহানির কারণ দেখিয়ে আমারব্লগ ডট কমের পক্ষ থেকে সামহোয়্যারইনে প্রকাশিত একটি পোস্ট মুছে দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : অভিযোগের ভিত্তি থাকায় ওই পোস্ট মুছে দেওয়া হয়।
জুলাই ২০১১
মানহানির কারণ দেখিয়ে আমারব্লগ ডট কমের পক্ষ থেকে সামহোয়্যারইনের একজন ব্লগারের একাউন্ট ব্লক করে দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : অভিযোগের ভিত্তি থাকায় কোনো একাউন্ট ব্লক করা হয়নি।
জুলাই ২০১১
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সামহোয়্যারইনে প্রকাশিত মোট ১টি 'মানহানিকর' পোস্ট মুছে দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : অভিযোগের ভিত্তি না থাকায় পোস্টটি মোছা হয়নি।
অক্টোবর ২০১১
কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগে world-guides.com নামের একটি ওয়েবসাইট সামহোয়্যারইনে প্রকাশিত ২টি ছবি মুছে দেওয়ার অনুরোধ জানায়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : ওই ২টি ছবি মুছে দেওয়া হয়।
জানুয়ারি ২০১২
কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগে world-guides.com নামের একটি ওয়েবসাইট সামহোয়্যারইনে প্রকাশিত ৪টি ছবি মুছে দেওয়ার অনুরোধ জানায়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : ওই ৪টি ছবিই মুছে দেওয়া হয়।
জানুয়ারি ২০১৩
বছরের শুরুতেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সামহোয়্যারইনে প্রকাশিত মোট ১টি 'মানহানিকর' পোস্ট মুছে দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : অভিযোগের ভিত্তি না থাকায় পোস্টটি মোছা হয়নি।
২২ মার্চ ২০১৩
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিটিআরসি) পক্ষ থেকে পাঠানো এক ইমেইলে ধর্মবিরোধী কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী লেখালেখির অভিযোগে সামহোয়্যারইন ব্লগের মোট চার জন ব্লগারের একাউন্ট স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিতে বলা হয়। এছাড়া ওই অ্যাকাউন্ট ব্যবহারকারীদের সম্পর্কে ব্যক্তিগত বিস্তারিত তথ্য (আইপি এড্রেস, লোকেশন, ইমেইল, মোবাইল নম্বর এবং ব্যক্তিগত নাম) পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিটিআরসির কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : সেই চারটি একাউন্ট বন্ধ করা নিয়ে কর্তৃপক্ষের অবস্থান এরকম-
১. আসিফ মহিউদ্দিন : তার একাউন্টটি এর আগেও একবার স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয়েছিল একই অভিযোগে। তবে পরে জাতীয় স্বার্থ ও নানান সামাজিক আন্দোলনে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং বিশেষ ভূমিকা বিবেচনায় আবারও খুলে দেয়া হয়।
২. আইনস্টাইন : বেশ কিছুদিন আগেই এই ব্লগারকে লগইন ব্যান করা হয় ধর্ম বিকৃতি ও অশ্লীলতার অভিযোগে।
৩. দাড়িপাল্লা : গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এই একাউন্টটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ধর্ম-অবমাননার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে।
৪. চিকন কালা : সম্প্রতি মধ্যরাতে ধর্ম-অবমাননামূলক একটি লেখা পোস্ট করে অল্প সময়ের মধ্যেই তা ড্রাফট করে নেয় এই ব্লগার। অতীতেও সে একই কাজ করেছে যার ফলে সে সবার নজরে তেমন আসেনি।
একাউন্টগুলো বন্ধ করা হলেও বিটিআরসির নির্দেশ অনুসারে কোনো ব্লগারেরই কোনো কনটেন্ট বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সরবরাহ করা হবে না বলে জানিয়ে দেয় সামহোয়্যারইন... ব্লগ কর্তৃপক্ষ।
(চলবে...)
মে ২০০৯
মানহানির কারণ দেখিয়ে আমারব্লগ ডট কমের পক্ষ থেকে সামহোয়্যারইনে প্রকাশিত তিনটি মন্তব্য মুছে দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : কোনো মন্তব্য মোছা হয়নি।
আগস্ট ২০১০
আমারব্লগ ডট কমের সহযোগী প্রতিষ্ঠান [link|http://e-bangladesh.org|]ই-বাংলাদেশ ডট অর্গ কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগে সামহোয়্যারইনে প্রকাশিত একটি ছবি মুছে দেওয়ার অনুরোধ জানায়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : ওই ছবিটি মুছে দেওয়া হয়।
জানুয়ারি ২০১১
কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগে marions-kochbuch.de নামের একটি ওয়েবসাইট সামহোয়্যারইনে প্রকাশিত একটি ছবি মুছে দেওয়ার অনুরোধ জানায়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : ওই ছবিটি মুছে দেওয়া হয়।
আগস্ট ২০১১
আবারও সেই marions-kochbuch.de! কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগে ওই ওয়েবসাইটটি সামহোয়্যারইনে প্রকাশিত একটি ছবি মুছে দেওয়ার অনুরোধ জানায়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : ওই ছবিটি মুছে দেওয়া হয়।
এপ্রিল ২০১১
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সামহোয়্যারইনে প্রকাশিত মোট ১০টি 'মানহানিকর' পোস্ট মুছে দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : মোট ৮টি পোস্ট মোছা হয়, অভিযোগের ভিত্তি না থাকায় বাকি ২টি পোস্ট বহাল থাকে।
মে ২০১১
এক মাস মাথায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আবারও সামহোয়্যারইনে প্রকাশিত মোট ১৮টি 'মানহানিকর' পোস্ট মুছে দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : মোট ৩টি পোস্ট মোছা হয়, অভিযোগের ভিত্তি না থাকায় বাকি ১৫টি পোস্ট বহাল থাকে।
জুলাই ২০১১
মানহানির কারণ দেখিয়ে আমারব্লগ ডট কমের পক্ষ থেকে সামহোয়্যারইনে প্রকাশিত একটি পোস্ট মুছে দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : অভিযোগের ভিত্তি থাকায় ওই পোস্ট মুছে দেওয়া হয়।
জুলাই ২০১১
মানহানির কারণ দেখিয়ে আমারব্লগ ডট কমের পক্ষ থেকে সামহোয়্যারইনের একজন ব্লগারের একাউন্ট ব্লক করে দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : অভিযোগের ভিত্তি থাকায় কোনো একাউন্ট ব্লক করা হয়নি।
জুলাই ২০১১
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সামহোয়্যারইনে প্রকাশিত মোট ১টি 'মানহানিকর' পোস্ট মুছে দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : অভিযোগের ভিত্তি না থাকায় পোস্টটি মোছা হয়নি।
অক্টোবর ২০১১
কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগে world-guides.com নামের একটি ওয়েবসাইট সামহোয়্যারইনে প্রকাশিত ২টি ছবি মুছে দেওয়ার অনুরোধ জানায়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : ওই ২টি ছবি মুছে দেওয়া হয়।
জানুয়ারি ২০১২
কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগে world-guides.com নামের একটি ওয়েবসাইট সামহোয়্যারইনে প্রকাশিত ৪টি ছবি মুছে দেওয়ার অনুরোধ জানায়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : ওই ৪টি ছবিই মুছে দেওয়া হয়।
জানুয়ারি ২০১৩
বছরের শুরুতেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সামহোয়্যারইনে প্রকাশিত মোট ১টি 'মানহানিকর' পোস্ট মুছে দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : অভিযোগের ভিত্তি না থাকায় পোস্টটি মোছা হয়নি।
২২ মার্চ ২০১৩
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিটিআরসি) পক্ষ থেকে পাঠানো এক ইমেইলে ধর্মবিরোধী কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী লেখালেখির অভিযোগে সামহোয়্যারইন ব্লগের মোট চার জন ব্লগারের একাউন্ট স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিতে বলা হয়। এছাড়া ওই অ্যাকাউন্ট ব্যবহারকারীদের সম্পর্কে ব্যক্তিগত বিস্তারিত তথ্য (আইপি এড্রেস, লোকেশন, ইমেইল, মোবাইল নম্বর এবং ব্যক্তিগত নাম) পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিটিআরসির কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান : সেই চারটি একাউন্ট বন্ধ করা নিয়ে কর্তৃপক্ষের অবস্থান এরকম-
১. আসিফ মহিউদ্দিন : তার একাউন্টটি এর আগেও একবার স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয়েছিল একই অভিযোগে। তবে পরে জাতীয় স্বার্থ ও নানান সামাজিক আন্দোলনে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং বিশেষ ভূমিকা বিবেচনায় আবারও খুলে দেয়া হয়।
২. আইনস্টাইন : বেশ কিছুদিন আগেই এই ব্লগারকে লগইন ব্যান করা হয় ধর্ম বিকৃতি ও অশ্লীলতার অভিযোগে।
৩. দাড়িপাল্লা : গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এই একাউন্টটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ধর্ম-অবমাননার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে।
৪. চিকন কালা : সম্প্রতি মধ্যরাতে ধর্ম-অবমাননামূলক একটি লেখা পোস্ট করে অল্প সময়ের মধ্যেই তা ড্রাফট করে নেয় এই ব্লগার। অতীতেও সে একই কাজ করেছে যার ফলে সে সবার নজরে তেমন আসেনি।
একাউন্টগুলো বন্ধ করা হলেও বিটিআরসির নির্দেশ অনুসারে কোনো ব্লগারেরই কোনো কনটেন্ট বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সরবরাহ করা হবে না বলে জানিয়ে দেয় সামহোয়্যারইন... ব্লগ কর্তৃপক্ষ।
(চলবে...)
সংযুক্তি
আপডেট ১ : আমারব্লগ কি বাংলাদেশে ব্লকড?
আজ ২ এপ্রিল রাত ১২টার পর থেকে বাংলাদেশের বেশ কিছু ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক থেকে আমারব্লগ ডট কম
দেখা যাচ্ছে না। যদিও প্রক্সি সাইটগুলো থেকে ব্লগটি ঠিকই দেখা যাচ্ছে। এ
থেকে ধারণা করা হচ্ছে, সরকার ওই ব্লগটি ব্লক করে দিয়েছে, যে কারণে বাংলাদেশ
থেকে ব্লগটি আর খোলা যাচ্ছে না। আমারব্লগের এডমিন সুশান্ত দাশগুপ্ত তার ফেসবুক টাইমলাইনে
জানিয়েছেন, তারা এখনও বিটিআরসি কিংবা তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় কিংবা
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় থেকে কোনো অফিসিয়াল চিঠি পাননি। তিনি বলেন, "আদৌ
বাংলাদেশ সরকার আমারব্লগ ব্লক করেছে কিনা অথবা করলেও ঠিক কী কারণে করা
হয়েছে সেটিও আমাদের জানা নেই।"
===
স্মরণাতীতকালে এমন দুঃসময় আর এমন মহাদুর্যোগ আর আসেনি, বাংলা ব্লগমণ্ডল এখন যার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। ব্লগার—এই মুহূর্তের বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র, সবচেয়ে দুর্ভাগাও। সরকারি হিসেবেই সংখ্যায় তারা প্রায় আড়াই লাখ। তবু এই মুহূর্তে তাদের মতো নিঃসঙ্গ কেউ নেই, তাদের পাশেও কেউ নেই। মোল্লারা তাদের ফাঁসি চেয়ে মিছিল করে, ধারালো ছোরায় জঙ্গিরা দেয় আরো শান। মৌলবাদিদের মুখপত্রগুলো আগেই প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা করেছে ব্লগারদের বিরুদ্ধে। ব্লগের লেখা বিচার করার জন্য পুলিশ-আমলা নিয়ে ৯ সদস্যের কমিটি পর্যন্ত গঠন করা হয়েছে খোদ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উৎসাহে। সংসদীয় কমিটিগুলো প্রতিনিয়ত ক্ষোভ ঝাড়ছে ব্লগের বিরুদ্ধে। পত্রিকার পাতায় ব্লগারদের নিয়ে দু কলম লেখার সময় হয় না কোনো বুদ্ধিজীবীর। তুচ্ছ ঘটনায় কতো বিবৃতিজীবীর দেখা মেলে, কিন্তু ব্লগের বিরুদ্ধে ক্রমাগত অপপ্রচার সবাই দেখেও না দেখার ভান করে থাকেন। মূলধারার কোনো গণমাধ্যম ব্লগবিরোধী নয় ঠিক, কিন্তু ব্লগারদের পাশে তারাও নেই। ক্রমাগত অপপ্রচারে সাধারণ মানুষের কাছে ব্লগার মানেই যেন নাস্তিকের আড্ডাখানা। ছোট এই যে বাংলা ব্লগমণ্ডল, সেখানেও দলাদলি আর নোংরামির ছড়াছড়ি। দুর্দিনে কে কাকে বাঁশ দিয়ে বিটিআরসি কিংবা সরকারের আস্থাভাজন হয়ে উঠবেন—সেই প্রতিযোগিতায় মেতে উঠতে দেখছি কাউকে কাউকে। এমনকি যে গণজাগরণ মঞ্চ গড়ে উঠেছিল কেবলই ব্লগারদের হাত ধরে, সেই মঞ্চও এখন আর ব্লগারদের পাশে নেই। ব্লগাররা আজ প্রকৃত অর্থেই একা—নিঃসঙ্গ।
ব্লগমণ্ডলের ইতিহাসে অভূতপূর্ব দুর্ঘটনা
গত ২২ মার্চ ঘটলো বাংলা ব্লগমণ্ডলের ইতিহাসে অভূতপূর্ব এক ঘটনা। সেদিন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিটিআরসি) পক্ষ থেকে সরকারি নির্দেশে ব্লগের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের লেখা পর্যবেক্ষণ করার বিষয়ে সামহোয়্যারইন ব্লগসহ কয়েকটি ব্লগের অ্যাডমিনকে ইমেইল করা হয়। তাতে নির্দেশ দেওয়া হয়, ব্লগ অ্যাকাউন্টগুলোর লেখায় ধর্মবিরোধী মন্তব্য পাওয়া গেলে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়ার জন্য। এছাড়াও অ্যাকাউন্ট ব্যবহারকারী সম্পর্কে ব্যক্তিগত বিস্তারিত তথ্য (আইপি এড্রেস, লোকেশন, ইমেইল, মোবাইল নম্বর এবং ব্যক্তিগত নাম) পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিটিআরসির কাছে পাঠানোর নির্দেশও দেয়া হয়।
তখনই ধরা পড়লো এক ব্লগ-রাজাকার
বিটিআরসির চাপে সব ব্লগই মোটামুটি কাবু হয়েছে। সামহোয়্যারইনে জানা নিজেও সাম্প্রতিক কিছু ব্যানের ব্যাপারে রাখঢাক করেননি। এক পোস্টে নিজে সেটি স্পষ্ট করেই বলেছেন কাকে কী কারণে ব্যান করা হয়েছে। বাংলাদেশের এমন কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা নেই, যেখানে স্বজাতির মধ্যেই বিশ্বাসঘাতক ছিল না। ব্লগও তার ব্যতিক্রম নয়, এখানেও আছে ব্লগ-রাজাকার। নিষ্ঠার সঙ্গে সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন আমার ব্লগের অ্যাডমিন যুবলীগ নেতা সুশান্ত দাশগুপ্ত। আচমকা বিপ্লবীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে পুরো ছাত্রলীগ স্টাইলে সেখানকার ব্লগারদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে বসেছেন তিনি। ২২ মার্চ "আমার ব্লগ বিটিআর সির সকল অপনির্দেশনা আজ থেকে প্রত্যাখান করছে" শীর্ষক দীর্ঘ বিপ্লবী গীত গেয়ে প্রায় চে গুয়েভারা হয়েই যাচ্ছিল। কিন্তু মাত্র দুদিন পর সুশান্ত বাবুর থলের বেড়াল বের করে দিয়ে বোমাটা ফাটালো অনলাইন সংবাদ সংস্থা 'বাংলামেইল'। 'বিটিআরসির নির্দেশে আপত্তিকর পোস্ট মুছে দিচ্ছে আমারব্লগ' শিরোনামের সেই প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পারলাম, বিটিআরসির নির্দেশ যেদিন এসেছে, সেই ২২ মার্চেই আমার ব্লগের অ্যাডমিন সুশান্ত দাশগুপ্ত বিটিআরসিকে মেইল দিয়ে 'সর্বাত্মক সহযোগিতা' প্রদানের কথা জানিয়ে দেন। সেই ইমেইলে তিনি amarblog.com/blogger/bnp ও amarblog.com/blogger/dinosaur ব্লগের সব পোস্ট মুছে দেয়ার কথা জানান। amarblog.com/blogs/arifuk ব্লগের পোস্ট মুছে দেয়ার কাজ চলছে জানিয়ে কোন্ পোস্টের আর্কাইভ কপি বিটিআরসির প্রয়োজন তাও জানাতে বিনীত অনুরোধ জানান সুশান্ত। বাংলামেইল বিটিআরসিকে পাঠানো সুশান্ত বাবুর ইমেইলের স্ক্রিনশটও প্রকাশ করে ওই প্রতিবেদনের সঙ্গে। এদিকে এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে যে, আওয়ামী লীগ বিরোধী কয়েকজন ব্লগারের আইপিসহ যাবতীয় তথ্য আমারব্লগ কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে বিটিআরসির হাতে তুলে দিয়েছে বা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই চোগলখুরি এখানেই শেষ হতে পারতো। কিন্তু না, গত ২৪ মার্চ ইনিয়ে-বিনিয়ে আবার সেই বিপ্লবী গীত, আবার সেই ভাঙা রেকর্ড আমারব্লগের পাতায় বাজলো- 'আমার ব্লগ বিটিআরসির সকল অপনির্দেশনা আজ থেকে প্রত্যাখান করছে! আন্তর্জালে বাংলা ব্লগ বাক স্বাধীনতা রক্ষায় আমরা বদ্ধপরিকর এবং তার জন্য যে কোন প্রকার আত্মত্যাগ স্বীকার করতে রাজী আছি...।' ঘটনা এখানেও শেষ হতে পারতো। কিন্তু না, সুশান্ত দাশগুপ্ত এই পর্যায়ে ইমেইলের স্ক্রিনশট থেকে শুরু করে পুরো ব্যাপারটিই বানোয়াট বলে দাবি করলেন। এমনকি বাংলামেইলকে ওই প্রতিবেদনটি মুছে ফেলার জন্যও জোরাজুরি শুরু করেন। কিন্তু বাংলামেইল আরো একধাপ এগিয়ে সুশান্তের দাবিই যে পুরোপুরি মিথ্যা এবং প্রতারণামূলক সেটি প্রমাণ করে দিল তার প্রতিবেদকের বক্তব্যে।
যে পথ ধরে ব্লগের ওপর নেমে আসছে সরকারি নিয়ন্ত্রণ
গত বুধবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর গঠিত কমিটির বৈঠকে জানানো হয়, ওইদিন থেকেই দু ধরনের অভিযোগ কেন্দ্র বা তথ্য কেন্দ্র খোলা হচ্ছে। অনলাইনে এবং সরাসরি ব্যক্তি পর্যায়ে অভিযোগ করার ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অভিযোগ কেন্দ্র বা তথ্য কেন্দ্র চালু করা হবে। কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাইনউদ্দিন খন্দকার বলেন, “ব্লগে যে কেউ লিখতে পারেন, তবে প্রকাশ করে ব্লগ কর্তৃপক্ষ। এক্ষেত্রে যারা ব্লগ পরিচালনা করেন বা ব্লগ সাইটের মালিক তাদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে।” আগামী ৩১ মার্চ এ কমিটি ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেমদের সঙ্গে বৈঠক করবে, এর পরপরই ব্লগ কর্তৃপক্ষ বা পরিচালনাকারীদের সঙ্গে বৈঠক হবে বলে জানান তিনি।
মাইনউদ্দিন খন্দকার বলেন, ব্লগে আপত্তিকর মন্তব্যকারীদের কোনো ছাড় দেয়া হবে না। বৈঠকে উপস্থিত কমিটির সদস্যরা বলেন, মডারেশন ছাড়া লেখা প্রকাশ করা কোনো ভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সব কিছুই নিয়ম-নীতির মধ্যে থাকা উচিত। কমিটির সদস্য আইন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব আবু আহমেদ জমাদার বলেন, “প্রচলিত আইন অনুযায়ী দোষী প্রমাণিত হলে আপত্তিকর মন্তব্যকারীদের এক কোটি টাকা জরিমানা এবং ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।” প্রয়োজনে আপত্তিকর মন্তব্যকারী ব্লগার ও ফেসবুক ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে সরকার সন্ত্রাস বিরোধী আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনেও বিচার করতে পারে বলে জানান আবু আহমেদ জমাদার। ইন্টারনট ব্যবহারকারী কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার এখতিয়ার রয়েছে এবং সেই তথ্য চাহিদা অনুযায়ী প্রদানে বাধ্যবাধকতাও রয়েছে বলে জানান আবু আহমেদ জমাদার।
কমিটির সদস্য তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোস্তফা জব্বার সভায় সরকারের দুর্বলতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘‘ব্লগ বা নিউজ পোর্টালের জন্য কোনো নীতিমালা নেই। তবে প্রতিকারের জন্য ১৯৭৩ সালের ছাপাখানা আইন রয়েছে। যাদের রয়েছে দায়বদ্ধতা। ব্লগে লেখার দায়িত্ব লেখকের ব্যক্তিগত হলেও প্রকাশকের দায়িত্ব সামগ্রিক।’’ তিনি বলেন, 'ব্লগ পরিচালনাকারীদের খতিয়ান নেওয়া উচিত।' সভায় একই সঙ্গে দেশের ৪৮টি ব্লগ তদারক করতে বিটিআরসিকে অনুরোধ করা হয়েছে।
বাকি যে লাখো ব্লগার, তাদের দোষ কী?
যে খবর আমরা ভেতর থেকে পাচ্ছি, তাতে প্রমাণ মিলছে ব্লগ নিয়ে সরকারি তৎপরতার লক্ষণ ভালো নয়।
স্পষ্টভাবেই সরকার হাঁটছে ব্লগ নিয়ন্ত্রণের পথে। এই আশঙ্কা আমরা আগেই প্রকাশ করেছিলাম, সরকার যখন অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিল। আমরা তখনই বলেছিলাম, অনলাইন নিয়ে সরকারের এই ঘাঁটাঘাটির মূল টার্গেট হবে ব্লগ। সেই আশঙ্কা আজ সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছে। মৌলবাদিদের মতো সরকারেরও অজুহাত ওই একটিই- নাস্তিক ব্লগার! অথচ পুরো বাংলা ব্লগমণ্ডলে 'নাস্তিক ব্লগার' ১০-১৫ জনও হয়তো পাওয়া যাবে না। নাস্তিক ব্লগারদের নিয়ে খোদ আমার দেশই তাদের প্রতিবেদনে মাত্র তিন কি চারজনের কর্মকান্ডের হদিস দিতে পেরেছে। তাহলে বাকি যে লাখো ব্লগার, তাদের দোষ কী? প্রায় প্রতিটি কমিউনিটি ব্লগের নীতিমালাতেই আপত্তিকর লেখা কিংবা মন্তব্যের জন্য সুনির্দিষ্ট বিধি আছে। এই নীতিমালা জোরদার করলেই যথেষ্ট। এর মধ্যে বিটিআরসি কিংবা সরকারের নাক গলানোর কিছুই নেই।
কেন ব্লগ কর্তৃপক্ষগুলোকে বসতে হবে আমলাপ্রধান সরকারি কমিটির সঙ্গে? কেন সরকার ছড়ি ঘোরাবে ব্লগের ওপর? বিটিআরসি কেন নজরদারি করবে ৪৮টি ব্লগের ওপর? ব্লগের সঙ্গে সম্পর্কহীন কতিপয় আমলার কী অধিকার কিংবা যোগ্যতা আছে এটা বলার- 'মডারেশন ছাড়া লেখা প্রকাশ করা কোনো ভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সব কিছুই নিয়ম-নীতির মধ্যে থাকা উচিত।' কেন মোস্তফা জব্বারের মতো সুবিধাবাদি লোক ব্লগের জন্য কুখ্যাত ছাপাখানা আইন প্রয়োগের জন্য দালালি করবেন?
গুগলে সার্চ করলেই দেখা যায়, কথায়-লেখায়-ছবিতে ইসলামকে চরম অপমান করা হয়েছে—এমন ওয়েবসাইটের সংখ্যা বিশ্বে হাজার হাজার। সরকারের কি সাধ্য আছে, এদের কোনো একটির কেশাগ্র স্পর্শ করার? বিশ্বে নাস্তিক আছে কোটি কোটি। সরকারের কি সাধ্য আছে, এদের কারো দিকে আঙ্গুলখানি শুধু তোলার? অথবা নাস্তিকের একটি গুগল একাউন্ট কিংবা একটি ফেসবুক একাউন্ট বন্ধ করার আবদারটুকু তুলে দেখুক তো সরকার! গুগল-ফেসবুকের যা কড়া নীতি, তাতে হয়তো এহেন অনুরোধকারীদের ভার্চুয়াল বলাৎকারই করে দেবে। মাত্র কিছুদিন আগেই আমরা জেনেছি, বিটিআরসির এরকম অনুরোধে ফেসবুক উল্টো কড়া মেইল দিয়ে জানতে চেয়েছে, একাউন্ট বন্ধের এই মামার বাড়ির আবদারের হেতু কী?
ব্লগকে শেকল পরানোর ছল
এক নাস্তিক আসিফ মহিউদ্দিনের ব্লগ বাতিলে যারা বগল বাজাচ্ছে, তারা জানে না, এই একই পরিণতি তাদের নিজেদেরও হতে পারে। সময়ের অপেক্ষা কেবল। আসিফের প্রতি আমার বিশেষ কোনো পক্ষপাত নেই, বরং কারণে-অকারণে ইসলাম ধর্ম নিয়ে তার কটুক্তি করার স্বভাবটা আমার অপছন্দ বরাবরই। কিন্তু এ নিয়ে দ্বিমত প্রকাশের কোনো উপায় নেই যে, সরকারি চাপে আসিফের ব্লগ ব্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। এই সংকেত জানিয়ে দিচ্ছে, ব্লগের ওপর যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার, তা থেকে ডান-বাম-মধ্যপন্থী-উদারপন্থী কেউই রেহাই পাবে না। কেউই না।
ব্লগারদের চাপে, ব্লগারদের অভিযোগে যদি আসিফের ব্লগ ব্যান করা হতো, বলার কিছুই ছিল না। কিন্তু এই ব্যান হয়েছে সরকারের চাপে, এই ব্যান হয়েছে মৌলবাদিদের চাপে। সামহোয়্যারইন কর্তৃপক্ষ লেখার কারণে নয়, তাকে স্পষ্টতই নিষিদ্ধ করেছে সরকারের চাপে। ব্লগার হিসেবে এই অপমান, এই গ্লানি আমাদের সবার।
আশঙ্কার কথা এই যে, চোর দরজার সিটকিনি খোলার পথটি জেনে গেছে, সুতরাং সে বার বার ওই ঘরে ঢোকার চেষ্টা করবেই। বিটিআরসির তরফে সরকার ইতিমধ্যে বুঝে গেছে, চোখ রাঙিয়ে ব্লগকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সুতরাং আজ ও আগামীতে আওয়ামী লীগ হোক কিংবা বিএনপি, যারাই সরকারে থাকুক, তারা কারণে-অকারণে ব্লগের ওপর ছড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করবে- এটা খুব স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে বিএনপিমনস্ক ব্লগার আর বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে আওয়ামী লীগ সমর্থক ব্লগারদের নাড়িনক্ষত্র জানা খুব কঠিন কোনো কাজ আর হবে না। অনলাইনে ভিন্নমতাবলম্বী যে কারো কন্ঠ চেপে ধরা, জেলে পোরা, জরিমানা করা ক্ষমতাসীনদের পক্ষে এখন খুবই সহজ হয়ে গেল।
এই যুদ্ধ সামহোয়্যারইনের একার যুদ্ধ
আগে-পরে ছোটখাটো আরো ব্লগের নাম সরকারি গোণায় এলেও মূল টার্গেট সামহোয়্যারইনই। ফলে বাক-স্বাধীনতা রক্ষার এই লড়াইয়ে সামহোয়্যারইন এবং তার ব্লগারদের দায়িত্বই সবচেয়ে বেশি। সামহোয়্যারইন যদি সরকারের চোখ রাঙানিতে পিছু হটে, সত্যিকারের যে নির্ভয় ব্লগিং, তার অপমৃত্যুও তখনই ঘটবে। মুক্তমত প্রকাশের ক্ষেত্র হিসেবে যে সামহোয়্যারইনের জন্য আমরা গর্ব বোধ করি, সেটি ধুলোয় মিশে যাবে। ছয় ছয়টি বছর ধরে তিল তিল করে একটি স্বাধীন বাংলা ব্লগের যে স্বপ্ন দেখে আসছিলাম আমরা, অকপটে সত্য বলার যে খোলা জানালার স্বপ্ন দেখে আসছিলাম, সেই স্বপ্নটুকু ধুলিসাৎ হয়ে যাবে নিমেষেই। এইটুকু বিশ্বাস এখনো রাখতে চাই, বাংলা ব্লগের এই দুঃসময়ে সামহোয়্যারইন কর্তৃপক্ষ তার ব্লগারদের পাশে থাকবে, পাশে দাঁড়াবে। যতো বৈঠকই হোক না কেন, যতো চাপই আসুক না কেন চোখে চোখ রেখে সরকারি পেয়াদাকে নিশ্চয়ই তারা বলে দেবেন, ব্লগের জন্য কোনো সরকারি নীতিমালা, কোনো কালো আইন আমরা চাই না। তারা স্পষ্টভাবে বলে দেবেন, ব্লগারদের আইপি তো দূরের, ব্যক্তিগত কোনো তথ্যই সরকারি সংস্থা বা অন্য কারো কাছে হস্তান্তর করা হবে না কখনোই। ব্লগারদের পক্ষ থেকে এই কথাও আশা করি তারা জানিয়ে দেবেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত কমিটি এবং টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিটিআরসি) সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আইনের পুরোপুরি লঙ্ঘন। কে না জানেন, এই বাংলাদেশে স্বাধীনভাবে কথা বলার প্রথম জানালাটি আরিল ও জানা নিজ হাতেই খুলে দিয়েছিলেন। আমি নিশ্চিত, সেই স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্থ হোক সেটি নিশ্চয়ই তারা চাইবেন না।
প্রিয় ব্লগার...
নিশ্চিত জেনে রাখুন, কেউই আপনার পাশে দাঁড়াবে না। ব্লগারমাত্রেই নিঃসঙ্গ—একা। তাতে ক্ষতি কিছু নেই, যে শেরপা ঝঞ্ঝাবিক্ষুদ্ধ এভারেস্টের শিখরে ওঠে অসীম সাহসে, সেও নিঃসঙ্গই থাকে। নিজের লড়াই এখানে নিজেকেই করতে হবে। আসুন ব্লগে সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই। নইলে-
উত্তর পুরুষে ভীরু কাপুরুষের উপমা হবো
এরকম দুঃসময়ে যদি মিছিলে না যাই...
===
স্মরণাতীতকালে এমন দুঃসময় আর এমন মহাদুর্যোগ আর আসেনি, বাংলা ব্লগমণ্ডল এখন যার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। ব্লগার—এই মুহূর্তের বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র, সবচেয়ে দুর্ভাগাও। সরকারি হিসেবেই সংখ্যায় তারা প্রায় আড়াই লাখ। তবু এই মুহূর্তে তাদের মতো নিঃসঙ্গ কেউ নেই, তাদের পাশেও কেউ নেই। মোল্লারা তাদের ফাঁসি চেয়ে মিছিল করে, ধারালো ছোরায় জঙ্গিরা দেয় আরো শান। মৌলবাদিদের মুখপত্রগুলো আগেই প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা করেছে ব্লগারদের বিরুদ্ধে। ব্লগের লেখা বিচার করার জন্য পুলিশ-আমলা নিয়ে ৯ সদস্যের কমিটি পর্যন্ত গঠন করা হয়েছে খোদ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উৎসাহে। সংসদীয় কমিটিগুলো প্রতিনিয়ত ক্ষোভ ঝাড়ছে ব্লগের বিরুদ্ধে। পত্রিকার পাতায় ব্লগারদের নিয়ে দু কলম লেখার সময় হয় না কোনো বুদ্ধিজীবীর। তুচ্ছ ঘটনায় কতো বিবৃতিজীবীর দেখা মেলে, কিন্তু ব্লগের বিরুদ্ধে ক্রমাগত অপপ্রচার সবাই দেখেও না দেখার ভান করে থাকেন। মূলধারার কোনো গণমাধ্যম ব্লগবিরোধী নয় ঠিক, কিন্তু ব্লগারদের পাশে তারাও নেই। ক্রমাগত অপপ্রচারে সাধারণ মানুষের কাছে ব্লগার মানেই যেন নাস্তিকের আড্ডাখানা। ছোট এই যে বাংলা ব্লগমণ্ডল, সেখানেও দলাদলি আর নোংরামির ছড়াছড়ি। দুর্দিনে কে কাকে বাঁশ দিয়ে বিটিআরসি কিংবা সরকারের আস্থাভাজন হয়ে উঠবেন—সেই প্রতিযোগিতায় মেতে উঠতে দেখছি কাউকে কাউকে। এমনকি যে গণজাগরণ মঞ্চ গড়ে উঠেছিল কেবলই ব্লগারদের হাত ধরে, সেই মঞ্চও এখন আর ব্লগারদের পাশে নেই। ব্লগাররা আজ প্রকৃত অর্থেই একা—নিঃসঙ্গ।
ব্লগমণ্ডলের ইতিহাসে অভূতপূর্ব দুর্ঘটনা
গত ২২ মার্চ ঘটলো বাংলা ব্লগমণ্ডলের ইতিহাসে অভূতপূর্ব এক ঘটনা। সেদিন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিটিআরসি) পক্ষ থেকে সরকারি নির্দেশে ব্লগের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের লেখা পর্যবেক্ষণ করার বিষয়ে সামহোয়্যারইন ব্লগসহ কয়েকটি ব্লগের অ্যাডমিনকে ইমেইল করা হয়। তাতে নির্দেশ দেওয়া হয়, ব্লগ অ্যাকাউন্টগুলোর লেখায় ধর্মবিরোধী মন্তব্য পাওয়া গেলে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়ার জন্য। এছাড়াও অ্যাকাউন্ট ব্যবহারকারী সম্পর্কে ব্যক্তিগত বিস্তারিত তথ্য (আইপি এড্রেস, লোকেশন, ইমেইল, মোবাইল নম্বর এবং ব্যক্তিগত নাম) পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিটিআরসির কাছে পাঠানোর নির্দেশও দেয়া হয়।
তখনই ধরা পড়লো এক ব্লগ-রাজাকার
বিটিআরসির চাপে সব ব্লগই মোটামুটি কাবু হয়েছে। সামহোয়্যারইনে জানা নিজেও সাম্প্রতিক কিছু ব্যানের ব্যাপারে রাখঢাক করেননি। এক পোস্টে নিজে সেটি স্পষ্ট করেই বলেছেন কাকে কী কারণে ব্যান করা হয়েছে। বাংলাদেশের এমন কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা নেই, যেখানে স্বজাতির মধ্যেই বিশ্বাসঘাতক ছিল না। ব্লগও তার ব্যতিক্রম নয়, এখানেও আছে ব্লগ-রাজাকার। নিষ্ঠার সঙ্গে সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন আমার ব্লগের অ্যাডমিন যুবলীগ নেতা সুশান্ত দাশগুপ্ত। আচমকা বিপ্লবীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে পুরো ছাত্রলীগ স্টাইলে সেখানকার ব্লগারদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে বসেছেন তিনি। ২২ মার্চ "আমার ব্লগ বিটিআর সির সকল অপনির্দেশনা আজ থেকে প্রত্যাখান করছে" শীর্ষক দীর্ঘ বিপ্লবী গীত গেয়ে প্রায় চে গুয়েভারা হয়েই যাচ্ছিল। কিন্তু মাত্র দুদিন পর সুশান্ত বাবুর থলের বেড়াল বের করে দিয়ে বোমাটা ফাটালো অনলাইন সংবাদ সংস্থা 'বাংলামেইল'। 'বিটিআরসির নির্দেশে আপত্তিকর পোস্ট মুছে দিচ্ছে আমারব্লগ' শিরোনামের সেই প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পারলাম, বিটিআরসির নির্দেশ যেদিন এসেছে, সেই ২২ মার্চেই আমার ব্লগের অ্যাডমিন সুশান্ত দাশগুপ্ত বিটিআরসিকে মেইল দিয়ে 'সর্বাত্মক সহযোগিতা' প্রদানের কথা জানিয়ে দেন। সেই ইমেইলে তিনি amarblog.com/blogger/bnp ও amarblog.com/blogger/dinosaur ব্লগের সব পোস্ট মুছে দেয়ার কথা জানান। amarblog.com/blogs/arifuk ব্লগের পোস্ট মুছে দেয়ার কাজ চলছে জানিয়ে কোন্ পোস্টের আর্কাইভ কপি বিটিআরসির প্রয়োজন তাও জানাতে বিনীত অনুরোধ জানান সুশান্ত। বাংলামেইল বিটিআরসিকে পাঠানো সুশান্ত বাবুর ইমেইলের স্ক্রিনশটও প্রকাশ করে ওই প্রতিবেদনের সঙ্গে। এদিকে এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে যে, আওয়ামী লীগ বিরোধী কয়েকজন ব্লগারের আইপিসহ যাবতীয় তথ্য আমারব্লগ কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে বিটিআরসির হাতে তুলে দিয়েছে বা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই চোগলখুরি এখানেই শেষ হতে পারতো। কিন্তু না, গত ২৪ মার্চ ইনিয়ে-বিনিয়ে আবার সেই বিপ্লবী গীত, আবার সেই ভাঙা রেকর্ড আমারব্লগের পাতায় বাজলো- 'আমার ব্লগ বিটিআরসির সকল অপনির্দেশনা আজ থেকে প্রত্যাখান করছে! আন্তর্জালে বাংলা ব্লগ বাক স্বাধীনতা রক্ষায় আমরা বদ্ধপরিকর এবং তার জন্য যে কোন প্রকার আত্মত্যাগ স্বীকার করতে রাজী আছি...।' ঘটনা এখানেও শেষ হতে পারতো। কিন্তু না, সুশান্ত দাশগুপ্ত এই পর্যায়ে ইমেইলের স্ক্রিনশট থেকে শুরু করে পুরো ব্যাপারটিই বানোয়াট বলে দাবি করলেন। এমনকি বাংলামেইলকে ওই প্রতিবেদনটি মুছে ফেলার জন্যও জোরাজুরি শুরু করেন। কিন্তু বাংলামেইল আরো একধাপ এগিয়ে সুশান্তের দাবিই যে পুরোপুরি মিথ্যা এবং প্রতারণামূলক সেটি প্রমাণ করে দিল তার প্রতিবেদকের বক্তব্যে।
যে পথ ধরে ব্লগের ওপর নেমে আসছে সরকারি নিয়ন্ত্রণ
গত বুধবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর গঠিত কমিটির বৈঠকে জানানো হয়, ওইদিন থেকেই দু ধরনের অভিযোগ কেন্দ্র বা তথ্য কেন্দ্র খোলা হচ্ছে। অনলাইনে এবং সরাসরি ব্যক্তি পর্যায়ে অভিযোগ করার ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অভিযোগ কেন্দ্র বা তথ্য কেন্দ্র চালু করা হবে। কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাইনউদ্দিন খন্দকার বলেন, “ব্লগে যে কেউ লিখতে পারেন, তবে প্রকাশ করে ব্লগ কর্তৃপক্ষ। এক্ষেত্রে যারা ব্লগ পরিচালনা করেন বা ব্লগ সাইটের মালিক তাদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে।” আগামী ৩১ মার্চ এ কমিটি ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেমদের সঙ্গে বৈঠক করবে, এর পরপরই ব্লগ কর্তৃপক্ষ বা পরিচালনাকারীদের সঙ্গে বৈঠক হবে বলে জানান তিনি।
মাইনউদ্দিন খন্দকার বলেন, ব্লগে আপত্তিকর মন্তব্যকারীদের কোনো ছাড় দেয়া হবে না। বৈঠকে উপস্থিত কমিটির সদস্যরা বলেন, মডারেশন ছাড়া লেখা প্রকাশ করা কোনো ভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সব কিছুই নিয়ম-নীতির মধ্যে থাকা উচিত। কমিটির সদস্য আইন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব আবু আহমেদ জমাদার বলেন, “প্রচলিত আইন অনুযায়ী দোষী প্রমাণিত হলে আপত্তিকর মন্তব্যকারীদের এক কোটি টাকা জরিমানা এবং ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।” প্রয়োজনে আপত্তিকর মন্তব্যকারী ব্লগার ও ফেসবুক ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে সরকার সন্ত্রাস বিরোধী আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনেও বিচার করতে পারে বলে জানান আবু আহমেদ জমাদার। ইন্টারনট ব্যবহারকারী কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার এখতিয়ার রয়েছে এবং সেই তথ্য চাহিদা অনুযায়ী প্রদানে বাধ্যবাধকতাও রয়েছে বলে জানান আবু আহমেদ জমাদার।
কমিটির সদস্য তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোস্তফা জব্বার সভায় সরকারের দুর্বলতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘‘ব্লগ বা নিউজ পোর্টালের জন্য কোনো নীতিমালা নেই। তবে প্রতিকারের জন্য ১৯৭৩ সালের ছাপাখানা আইন রয়েছে। যাদের রয়েছে দায়বদ্ধতা। ব্লগে লেখার দায়িত্ব লেখকের ব্যক্তিগত হলেও প্রকাশকের দায়িত্ব সামগ্রিক।’’ তিনি বলেন, 'ব্লগ পরিচালনাকারীদের খতিয়ান নেওয়া উচিত।' সভায় একই সঙ্গে দেশের ৪৮টি ব্লগ তদারক করতে বিটিআরসিকে অনুরোধ করা হয়েছে।
বাকি যে লাখো ব্লগার, তাদের দোষ কী?
যে খবর আমরা ভেতর থেকে পাচ্ছি, তাতে প্রমাণ মিলছে ব্লগ নিয়ে সরকারি তৎপরতার লক্ষণ ভালো নয়।
স্পষ্টভাবেই সরকার হাঁটছে ব্লগ নিয়ন্ত্রণের পথে। এই আশঙ্কা আমরা আগেই প্রকাশ করেছিলাম, সরকার যখন অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিল। আমরা তখনই বলেছিলাম, অনলাইন নিয়ে সরকারের এই ঘাঁটাঘাটির মূল টার্গেট হবে ব্লগ। সেই আশঙ্কা আজ সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছে। মৌলবাদিদের মতো সরকারেরও অজুহাত ওই একটিই- নাস্তিক ব্লগার! অথচ পুরো বাংলা ব্লগমণ্ডলে 'নাস্তিক ব্লগার' ১০-১৫ জনও হয়তো পাওয়া যাবে না। নাস্তিক ব্লগারদের নিয়ে খোদ আমার দেশই তাদের প্রতিবেদনে মাত্র তিন কি চারজনের কর্মকান্ডের হদিস দিতে পেরেছে। তাহলে বাকি যে লাখো ব্লগার, তাদের দোষ কী? প্রায় প্রতিটি কমিউনিটি ব্লগের নীতিমালাতেই আপত্তিকর লেখা কিংবা মন্তব্যের জন্য সুনির্দিষ্ট বিধি আছে। এই নীতিমালা জোরদার করলেই যথেষ্ট। এর মধ্যে বিটিআরসি কিংবা সরকারের নাক গলানোর কিছুই নেই।
কেন ব্লগ কর্তৃপক্ষগুলোকে বসতে হবে আমলাপ্রধান সরকারি কমিটির সঙ্গে? কেন সরকার ছড়ি ঘোরাবে ব্লগের ওপর? বিটিআরসি কেন নজরদারি করবে ৪৮টি ব্লগের ওপর? ব্লগের সঙ্গে সম্পর্কহীন কতিপয় আমলার কী অধিকার কিংবা যোগ্যতা আছে এটা বলার- 'মডারেশন ছাড়া লেখা প্রকাশ করা কোনো ভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সব কিছুই নিয়ম-নীতির মধ্যে থাকা উচিত।' কেন মোস্তফা জব্বারের মতো সুবিধাবাদি লোক ব্লগের জন্য কুখ্যাত ছাপাখানা আইন প্রয়োগের জন্য দালালি করবেন?
গুগলে সার্চ করলেই দেখা যায়, কথায়-লেখায়-ছবিতে ইসলামকে চরম অপমান করা হয়েছে—এমন ওয়েবসাইটের সংখ্যা বিশ্বে হাজার হাজার। সরকারের কি সাধ্য আছে, এদের কোনো একটির কেশাগ্র স্পর্শ করার? বিশ্বে নাস্তিক আছে কোটি কোটি। সরকারের কি সাধ্য আছে, এদের কারো দিকে আঙ্গুলখানি শুধু তোলার? অথবা নাস্তিকের একটি গুগল একাউন্ট কিংবা একটি ফেসবুক একাউন্ট বন্ধ করার আবদারটুকু তুলে দেখুক তো সরকার! গুগল-ফেসবুকের যা কড়া নীতি, তাতে হয়তো এহেন অনুরোধকারীদের ভার্চুয়াল বলাৎকারই করে দেবে। মাত্র কিছুদিন আগেই আমরা জেনেছি, বিটিআরসির এরকম অনুরোধে ফেসবুক উল্টো কড়া মেইল দিয়ে জানতে চেয়েছে, একাউন্ট বন্ধের এই মামার বাড়ির আবদারের হেতু কী?
ব্লগকে শেকল পরানোর ছল
এক নাস্তিক আসিফ মহিউদ্দিনের ব্লগ বাতিলে যারা বগল বাজাচ্ছে, তারা জানে না, এই একই পরিণতি তাদের নিজেদেরও হতে পারে। সময়ের অপেক্ষা কেবল। আসিফের প্রতি আমার বিশেষ কোনো পক্ষপাত নেই, বরং কারণে-অকারণে ইসলাম ধর্ম নিয়ে তার কটুক্তি করার স্বভাবটা আমার অপছন্দ বরাবরই। কিন্তু এ নিয়ে দ্বিমত প্রকাশের কোনো উপায় নেই যে, সরকারি চাপে আসিফের ব্লগ ব্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। এই সংকেত জানিয়ে দিচ্ছে, ব্লগের ওপর যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার, তা থেকে ডান-বাম-মধ্যপন্থী-উদারপন্থী কেউই রেহাই পাবে না। কেউই না।
ব্লগারদের চাপে, ব্লগারদের অভিযোগে যদি আসিফের ব্লগ ব্যান করা হতো, বলার কিছুই ছিল না। কিন্তু এই ব্যান হয়েছে সরকারের চাপে, এই ব্যান হয়েছে মৌলবাদিদের চাপে। সামহোয়্যারইন কর্তৃপক্ষ লেখার কারণে নয়, তাকে স্পষ্টতই নিষিদ্ধ করেছে সরকারের চাপে। ব্লগার হিসেবে এই অপমান, এই গ্লানি আমাদের সবার।
আশঙ্কার কথা এই যে, চোর দরজার সিটকিনি খোলার পথটি জেনে গেছে, সুতরাং সে বার বার ওই ঘরে ঢোকার চেষ্টা করবেই। বিটিআরসির তরফে সরকার ইতিমধ্যে বুঝে গেছে, চোখ রাঙিয়ে ব্লগকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সুতরাং আজ ও আগামীতে আওয়ামী লীগ হোক কিংবা বিএনপি, যারাই সরকারে থাকুক, তারা কারণে-অকারণে ব্লগের ওপর ছড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করবে- এটা খুব স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে বিএনপিমনস্ক ব্লগার আর বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে আওয়ামী লীগ সমর্থক ব্লগারদের নাড়িনক্ষত্র জানা খুব কঠিন কোনো কাজ আর হবে না। অনলাইনে ভিন্নমতাবলম্বী যে কারো কন্ঠ চেপে ধরা, জেলে পোরা, জরিমানা করা ক্ষমতাসীনদের পক্ষে এখন খুবই সহজ হয়ে গেল।
এই যুদ্ধ সামহোয়্যারইনের একার যুদ্ধ
আগে-পরে ছোটখাটো আরো ব্লগের নাম সরকারি গোণায় এলেও মূল টার্গেট সামহোয়্যারইনই। ফলে বাক-স্বাধীনতা রক্ষার এই লড়াইয়ে সামহোয়্যারইন এবং তার ব্লগারদের দায়িত্বই সবচেয়ে বেশি। সামহোয়্যারইন যদি সরকারের চোখ রাঙানিতে পিছু হটে, সত্যিকারের যে নির্ভয় ব্লগিং, তার অপমৃত্যুও তখনই ঘটবে। মুক্তমত প্রকাশের ক্ষেত্র হিসেবে যে সামহোয়্যারইনের জন্য আমরা গর্ব বোধ করি, সেটি ধুলোয় মিশে যাবে। ছয় ছয়টি বছর ধরে তিল তিল করে একটি স্বাধীন বাংলা ব্লগের যে স্বপ্ন দেখে আসছিলাম আমরা, অকপটে সত্য বলার যে খোলা জানালার স্বপ্ন দেখে আসছিলাম, সেই স্বপ্নটুকু ধুলিসাৎ হয়ে যাবে নিমেষেই। এইটুকু বিশ্বাস এখনো রাখতে চাই, বাংলা ব্লগের এই দুঃসময়ে সামহোয়্যারইন কর্তৃপক্ষ তার ব্লগারদের পাশে থাকবে, পাশে দাঁড়াবে। যতো বৈঠকই হোক না কেন, যতো চাপই আসুক না কেন চোখে চোখ রেখে সরকারি পেয়াদাকে নিশ্চয়ই তারা বলে দেবেন, ব্লগের জন্য কোনো সরকারি নীতিমালা, কোনো কালো আইন আমরা চাই না। তারা স্পষ্টভাবে বলে দেবেন, ব্লগারদের আইপি তো দূরের, ব্যক্তিগত কোনো তথ্যই সরকারি সংস্থা বা অন্য কারো কাছে হস্তান্তর করা হবে না কখনোই। ব্লগারদের পক্ষ থেকে এই কথাও আশা করি তারা জানিয়ে দেবেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত কমিটি এবং টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিটিআরসি) সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আইনের পুরোপুরি লঙ্ঘন। কে না জানেন, এই বাংলাদেশে স্বাধীনভাবে কথা বলার প্রথম জানালাটি আরিল ও জানা নিজ হাতেই খুলে দিয়েছিলেন। আমি নিশ্চিত, সেই স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্থ হোক সেটি নিশ্চয়ই তারা চাইবেন না।
প্রিয় ব্লগার...
নিশ্চিত জেনে রাখুন, কেউই আপনার পাশে দাঁড়াবে না। ব্লগারমাত্রেই নিঃসঙ্গ—একা। তাতে ক্ষতি কিছু নেই, যে শেরপা ঝঞ্ঝাবিক্ষুদ্ধ এভারেস্টের শিখরে ওঠে অসীম সাহসে, সেও নিঃসঙ্গই থাকে। নিজের লড়াই এখানে নিজেকেই করতে হবে। আসুন ব্লগে সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই। নইলে-
উত্তর পুরুষে ভীরু কাপুরুষের উপমা হবো
এরকম দুঃসময়ে যদি মিছিলে না যাই...
সংযুক্তি
ঠিক এখনই যিনি হাসিমুখে নিজের দিনলিপি লিখছেন প্রথম পাতায়, তার বোঝার
উপায় নেই যে, ১০০০ পিক্সেল প্রস্থের এই সামহোয়্যারইন...ব্লগের ভেতরে কী
রক্তক্ষরণ চলছে এখন! এক দলের চোখ রাঙানি সামাল দিতে না দিতেই সামহোয়্যারকে
লড়তে হচ্ছে আরেক দলের সঙ্গে। তাদের কেউ চেনা, কেউ অচেনা। কেউ ডান, কেউ বাম,
কেউবা চরমপন্থী। তাদের সকল আক্রোশ একযোগে এসে জমা হয়েছে সামহোয়্যারইনের
ওপর। যে 'ব্লগার' নামে আজ কাঁপছে বাংলাদেশ, সেই ব্লগারদের পথিকৃৎ যারা,
বাংলাভাষায় কমিউনিটি ব্লগের সূচনা হয়েছিল যাদের হাতে, চেনা দুনিয়ার বাইরে
মুক্তচিন্তার দরজা খুলে দিয়েছিলেন যারা, আধুনিক এই বাংলাদেশে তারাই আজ
মধ্যযুগীয় এক নোংরা খেলার শিকার। স্বার্থান্বেষী সব মহলই এখন চাইছে
মুক্তচিন্তার সবল এই জানালাটি বন্ধ হয়ে যাক। কারণ অনলাইন তো বটেই, এমনকি
অফলাইনেও এই এখন পুরো বাংলাদেশে নিঃশঙ্ক চিত্তে মতামত প্রকাশ প্রকাশের বড়ো
জায়গা এই একটিই।
সবার শত্রু, কিন্তু বিপদে সবার আশ্রয়
কী ডান-কী বাম, কী আওয়ামী লীগ-কী বিএনপি, কী আস্তিক-কী নাস্তিক, জামায়াত-শিবির চক্র তো বটেই, এমনকি সরকারেরও চক্ষুশূল হয়ে উঠেছে আমাদের এই সামহোয়্যারইন ব্লগ। ডান মনে করে সামহোয়্যারইন বাম অধ্যুষিত ব্লগ, আবার বামের ধারণা এটি ডানের আস্তানা। আওয়ামী লীগের বড়ো বড়ো নেতা সরাসরি এই ব্লগের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন নানা সময়ে, আর বিএনপি এখন স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ব্লগই বন্ধ করে দেওয়ার আহবান জানাচ্ছে। আস্তিকরা সবসময়ই ভেবে এসেছেন সামহোয়্যারইন নাস্তিকদের প্রশ্রয় দেয়, আবার নাস্তিকরা তারও একধাপ ওপরে উঠে ঘোষণা দেন সামহোয়্যারের মডারেটররাই নাকি মৌলবাদি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সামহোয়্যারের স্পষ্ট অবস্থান সবসময়ই স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবির চক্রের মাথাব্যথার কারণ। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা কখনো 'সাধারণ মুসল্লি' সেজে, কখনো 'ইসলামি আলেম-ওলামা' সেজে সরাসরি সামহোয়্যারইন ব্লগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে মিছিল-সমাবেশ-বিক্ষোভ করে যাচ্ছে। কিন্তু যখনই প্রয়োজন পড়েছে, যখনই কোনো মিডিয়ায় কেউ কথা বলতে পারেনি - প্রত্যেকেই এসে উপস্থিত হয়েছে বাংলাভাষার বৃহত্তম এই ব্লগে। ব্লগের উদারনীতির সুযোগ নিয়ে মত-পথ নির্বিশেষে প্রত্যেকেই এই ব্লগের জনপ্রিয়তাকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাতে দ্বিধা করেনি। করে যাচ্ছে এখনো।
স্বাধীনতাবিরোধীদের চক্ষুশূল সামহোয়্যারইন
ধর্মান্ধ ও ধর্মব্যবসায়ীরা গত কিছুদিন ধরে বেশ আঁটঘাট বেধে ব্লগের পেছনে লেগেছে। তথাকথিত 'আলেম সমাজের ' ব্যানারে গত শুক্রবার এরা সারা দেশেই বিক্ষোভ কর্মসূচির আয়োজন করেছিল। এটি এখন কারোরই অজানা নয় যে, শাহবাগকেন্দ্রিক গণজাগরণের নেপথ্যে যেহেতু ব্লগাররা ছিল, মূলত সেই ব্লগারদের ঘায়েল করতেই 'আলেম সমাজের ' ব্যানারে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবির চক্র ব্লগারদের চরিত্রহনন ও ব্লগ বন্ধ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। প্রতি ৫০ হাজার ব্লগারের মধ্যে একজন হয়তো ধর্ম নিয়ে টানাহেঁচড়া করেন, তাতে কি বাকি সব ব্লগারই ধর্মবিরোধী নাস্তিক হয়ে যান? ইউটিউবের একটি কি দুটি ক্লিপে ইসলাম ধর্মের অবমাননাসূচক বার্তা আছে, তাতে কি পুরো ইউটিউবই বন্ধ করে দিতে হবে? ইন্টারনেট জুড়ে ইসলাম ধর্মের কুৎসা গাওয়া হাজার হাজার ওয়েবসাইট আছে, তার মানে কি সব ওয়েবসাইটই বন্ধ করে দিতে হবে?
বাংলানিউজের হলদে সাংবাদিকতা
বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোরে গত ৯ থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি টানা তিন দিন ধরে সামহোয়্যারইনের বিরুদ্ধে একের পর এক কুৎসা রচনা করা হল। আজ থেকে চার বছর আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণস্বাক্ষর সংগ্রহের অভিযান শুরু করেছিল যে ব্লগটি, তার বিরুদ্ধেই উল্টো অভিযোগ তোলা হল শিবির তোষণের, সার্বভৌমত্ববিরোধী কার্যকলাপের। গত ৫ ফেব্রুয়ারির শুরুতে শাহবাগে ব্যানার হাতে জনাবিশেকও হবে না উপস্থিতি, আজকের গণজাগরণ বিশেষজ্ঞ অনলবর্ষী বক্তারা-টকশোজীবী সুবিধাবাদীরা তখনো শাহবাগ থেকে বহু দূরে, কিন্তু সামহোয়্যারইন পোস্ট স্টিকি করে সেই পাঁচ তারিখেই আওয়াজ তুলেছে - 'রাজাকারের ফাঁসির দাবীতে গর্জে উঠেছে বাংলাদেশ: চল চল শাহবাগ চল।' তবু সামহোয়্যারইন নাকি শাহবাগ নিয়ে বিতর্কিত ভূমিকায়! কেবল তাই নয়, হলুদ সাংবাদিকতার নিকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে ওঠা বাংলানিউজ এই ফাঁকে একপ্রস্থ ভয় দেখানোর চেষ্টাও করেছে সামহোয়্যারকে। বিচারের ভার ব্লগারদের হাতে।
আমার দেশের ধারাবাহিক কুৎসা
বেশ কিছুদিন ধরে স্বাধীনতা বিরোধীদের মুখপত্র হয়ে ওঠা 'আমার দেশ' ও যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেম আলীর 'নয়াদিগন্ত' রীতিমতো প্রধান প্রতিবেদন-বিশেষ প্রতিবেদন সাজিয়ে সামহোয়্যারইনকে নগ্নভাবে আক্রমণ তো করছেই, সঙ্গে ধর্মান্ধদের জন্য তৈরি করে দিচ্ছে উস্কানির তাজা সব উপকরণ। গত ২০ ফেব্রুয়ারি আমার দেশের প্রধান প্রতিবেদন ছিল - "ব্লগে নাস্তিকতার নামে কুত্ সিত অসভ্যতা।" মাত্র তিন জন ব্লগারের লেখালেখির ওপর ভিত্তি করে ফোলানো-ফাঁপানো ওই প্রতিবেদনে বাকি সব ব্লগারকেই 'অসভ্য' বলে ঢালাও আক্রমণ করা হয়। মজার ব্যাপার হল, ১১ ফেব্রুয়ারি বাংলানিউজ বায়বীয় সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগ ফেঁদে বসে, সামহোয়্যার শিবির-তোষণ করছে। এর মাত্র নয় দিন পর ২০ ফেব্রুয়ারি জামায়াত-শিবিরের মুখপত্র 'আমার দেশ' ঠিক তার উল্টো অভিযোগ তুলে বসে। এক প্রতিবেদনে তারা উস্কানি যুগিয়েছে এভাবে - "যেখানে আওয়ামী লীগ সরকারের যৌক্তিক সমালোচনার কারণেও ব্লগ বাতিল করা হয়, সেখানে ধর্ম নিয়ে অশ্লীলতার পরও কীভাবে এরা পার পেয়ে গেছে বিকৃত মানসিকতার নাস্তিক ও আওয়ামী সমর্থিত পাণ্ডারা? কী এজেন্ডা নিয়ে সামহোয়্যারইন ব্লগ পরিচালিত হচ্ছে? শান্তির ধর্ম, মানবতার ধর্ম ইসলাম অবমাননাকারীদের ‘লালন’ করার সাহস কোথায় পেয়েছে সামহোয়্যারইন ব্লগ মালিক কর্তৃপক্ষ?"
২২ ফেব্রুয়ারিও শীর্ষ প্রতিবেদন করা হয় এই শিরোনামে - "ধর্ম ও আদালতের অবমাননা করছে ব্লগারচক্র"। যথারীতি ওই প্রতিবেদনেও মাত্র পাঁচ জন ব্লগারের কর্মকাণ্ডের জন্য বাকি সব ব্লগারের শাস্তি দাবি তো বটেই, সামহোয়্যারইনসহ বিভিন্ন ব্লগ বন্ধ করে দেওয়ার দাবিও জানানো হয়। এগুলোই নয় কেবল, গত কিছুদিন ধরে এই পত্রিকাটি ব্লগ ও ব্লগারদের বিরুদ্ধে একের পর এক কুৎসা গেয়ে যাচ্ছে, এমনকি ব্লগারদের ফাঁসি দেওয়ারও আহ্বান জানাচ্ছে। যেন বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির প্রতিশোধ পত্রিকাটি নেবেই নেবে! সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হচ্ছে, ব্লগমণ্ডলে সুপরিচিত সেই সাইবার ক্রিমিনাল চক্রটি আমার দেশের মন্তব্যের ঘরে এসে চালিয়ে যাচ্ছে সেই নোংরা কাজটি। Iam Bangladeshi নামে একটি ভুয়া ফেসবুক নিক থেকে জানার নাম ও ফোন নম্বর তুলে দিয়ে অশালীন ও অসত্য মন্তব্য শুধু ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপেই নয়, করা হচ্ছে আমার দেশ অনলাইন সংস্করণের বিভিন্ন প্রতিবেদনের নিচেও।
হোয়াইট কলার 'প্রগতিশীল'
আজ থেকে চার বছর আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণস্বাক্ষর সংগ্রহের মতো অভিনব উদ্যোগ এই সামহোয়্যারইনই নিয়েছিল প্রথম। পাশাপাশি জনসমক্ষে সেটাকে উপস্থাপনের ভারও স্বেচ্ছায় নেয় সামহোয়্যারইন। এই সামহোয়্যারইনই প্রথম দেশ ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী লেখালেখির বিপক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়ে নীতিমালায় বিশেষ ধারা সংযোজন করে। অনলাইনে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির সঙ্গে সবচেয়ে স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইগুলোও হয়েছে এই সামহোয়্যারইনেই। গত কয়েক বছরে প্রগতিশীল এমন কোনো আন্দোলন নেই, যেখানে সামহোয়্যারইন কিংবা তার ব্লগারদের ভূমিকা ছিল না। এমনকি তেল-গ্যাস রক্ষা আন্দোলন কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ফি বৃদ্ধির মতো আন্দোলনেও সামহোয়্যার রেখেছে অসামান্য ভূমিকা।
তারপরও সামহোয়্যারইনকে পরীক্ষা দিতে হয় অথর্ব, মেধাহীন-মতলববাজ, সাইবার ক্রিমিনালদের কাছে। এটা এখন অনেকেরই জানা যে, স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিই নয় কেবল, গণজাগরণ মঞ্চের আশেপাশেও কিছু স্বার্থান্বেষী ঘুর ঘুর করেন সামহোয়্যারের গলায় দড়ি ঝোলানোর মতলব নিয়ে। এই কদিনে কম চেষ্টা হয়নি গণজাগরণ মঞ্চ থেকে এটা বলানোর - "সামহোয়্যারইন একটি ছাগুব্লগ।" সেই চেষ্টা এখনো চলছে। যদিও এখন পর্যন্ত গণজাগরণ মঞ্চের পরিচালকদের তারা এই অপকর্মে রাজি করাতে পারেনি। পারলেই বা কী! শাহবাগ গণজাগরণের সঙ্গে সামহোয়্যারইনের সম্পর্কটা নাড়ির। ওই গণজাগরণের ভিত্তিটা গড়ে দিয়েছিল এই সামহোয়্যারইনই। এই সত্যটুকুও অনেকে অস্বীকার করতে চান। কাদের মোল্লার ফাঁসি চেয়ে শাহবাগে যখন ব্লগাররা গেলেন, সংখ্যা তখনও একেবারেই হাতেগোনা। তাদেরও বেশিরভাগই ছিলেন এই সামহোয়্যারের ব্লগার। সেই পাঁচ তারিখেই পোস্ট স্টিকি করে সামহোয়্যারইন...ব্লগ আওয়াজ তুলেছে - 'রাজাকারের ফাঁসির দাবীতে গর্জে উঠেছে বাংলাদেশ: চল চল শাহবাগ চল।
জানাকে নিয়ে বিপজ্জনক নোংরামি
জানা ও আরিলকে অশালীনভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে বারবার। তাদের শিশুকন্যাটিও ওই কুৎসিত থাবা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। না, এ কোনো স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের কাজ নয়। প্রগতিশীলতার মুখোশ পরে যারা ব্লগে-ফেসবুকে ঘোরাফেরা করে, নিজেকে নেতা বানানোর চেষ্টায় যারা মরিয়া, নিজের নাক কেটে যারা পরের যাত্রা ভঙ্গ করতে সিদ্ধহস্ত, তারাই নোংরা এই কাজটি করে যাচ্ছে খুব পরিকল্পিতভাবে। এর আগে এই চক্রটিই কয়েকজন নারী ব্লগারের নাম দিয়ে অশ্লীল সাইট তৈরি করে, ভুয়া ভিডিও ক্লিপ তৈরি করে ইন্টারনেটে ছেড়ে দিয়েছিল। জানাকে নিয়ে ব্লগস্পট-ওয়ার্ডপ্রেসে অশালীন সাইট খোলা হয়েছে। ছবি বিকৃত করে নানান অপপ্রচার চলেছে। কিন্তু সামহোয়্যারইন তো নয়ই, জানাও তাতে এতোটুকু দমেননি। পরিস্থিতির সুযোগ বুঝে এবার সেই চক্রটিই জানার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে উঠে পড়ে লেগেছে নতুন উদ্যমে, আরো নোংরা কৌশল নিয়ে, আরো বিপজ্জনক উপায়ে। রাতভর যে 'মুক্তিযুদ্ধ গবেষকের' মূল কাজ ইন্টারনেটে চেনা-অচেনা পর্নো ক্লিপ আপলোড করা, রগরগে চটি লেখা - তিনিও এখন বিদগ্ধ ব্লগার সেজে সামহোয়্যারকে একহাত দেখে নেওয়ার চেষ্টায় রাতদিন শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। চার-পাঁচদিন আগে হঠাৎই জানার মোবাইলে কিছু কল আসা শুরু হল। সেই সব কলে অশ্লীল যৌন ইঙ্গিতবহ নানা প্রস্তাব দেওয়া হতে লাগলো। পরে গুগল করে অন্তত দুটি গ্রুপের খোঁজ পাওয়া গেল, যেখানে জানার নাম ও ব্যক্তিগত ফোন নম্বর ব্যবহার করে অশ্লীল স্ট্যাটাস প্রচার করা হয়েছে। লক্ষ্য দুটি- প্রথমত জানার ভাবমূর্তিতে কালিমা লেপনের চেষ্টা, দ্বিতীয়ত সামহোয়্যারইন ব্লগটিই বন্ধ করে দেওয়া।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, জানা-আরিল দুজনেই জামায়াত-শিবির অপশক্তির হিটলিস্টে আছেন। বাংলাভাষাভাষীদের মুক্তমত প্রকাশের জায়গা করে দিয়ে দুজনেই এখন তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কায় দিনরাত কাটাচ্ছেন। বাংলা আর বাংলাদেশকে ভালোবেসে যে আরিল্ড ক্লকারহগ এবং সৈয়দা গুলশান ফেরদৌস জানা বিপুল ব্যয়ভার বহন করে বাংলাভাষায় প্রথম কমিউনিটি ব্লগটি প্রতিষ্ঠা করে ছয় ছয়টি বছর ধরে কঠিন এই বোঝা টেনে চলেছেন, লাখ লাখ বাংলাভাষীকে ব্লগমাধ্যমটির সঙ্গে প্রথম পরিচিত করিয়েছেন, সেই তারাই আজ একদিকে একদল হিংস্র পশুর রক্তচক্ষুর মুখোমুখি, অন্যদিকে প্রগতিশীলতার মুখোশ পরা আরেক দল মানসিক রোগীর নোংরা খেলার শিকার। এই দুর্বৃত্তদের হাত থেকে বাঁচাতেই হবে আমাদের প্রিয় ব্লগকে।
কেউ কি টের পাচ্ছেন, প্রিয় সামহোয়্যারের ভেতরে কী রক্তক্ষরণ চলছে!
সবার শত্রু, কিন্তু বিপদে সবার আশ্রয়
কী ডান-কী বাম, কী আওয়ামী লীগ-কী বিএনপি, কী আস্তিক-কী নাস্তিক, জামায়াত-শিবির চক্র তো বটেই, এমনকি সরকারেরও চক্ষুশূল হয়ে উঠেছে আমাদের এই সামহোয়্যারইন ব্লগ। ডান মনে করে সামহোয়্যারইন বাম অধ্যুষিত ব্লগ, আবার বামের ধারণা এটি ডানের আস্তানা। আওয়ামী লীগের বড়ো বড়ো নেতা সরাসরি এই ব্লগের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন নানা সময়ে, আর বিএনপি এখন স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ব্লগই বন্ধ করে দেওয়ার আহবান জানাচ্ছে। আস্তিকরা সবসময়ই ভেবে এসেছেন সামহোয়্যারইন নাস্তিকদের প্রশ্রয় দেয়, আবার নাস্তিকরা তারও একধাপ ওপরে উঠে ঘোষণা দেন সামহোয়্যারের মডারেটররাই নাকি মৌলবাদি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সামহোয়্যারের স্পষ্ট অবস্থান সবসময়ই স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবির চক্রের মাথাব্যথার কারণ। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা কখনো 'সাধারণ মুসল্লি' সেজে, কখনো 'ইসলামি আলেম-ওলামা' সেজে সরাসরি সামহোয়্যারইন ব্লগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে মিছিল-সমাবেশ-বিক্ষোভ করে যাচ্ছে। কিন্তু যখনই প্রয়োজন পড়েছে, যখনই কোনো মিডিয়ায় কেউ কথা বলতে পারেনি - প্রত্যেকেই এসে উপস্থিত হয়েছে বাংলাভাষার বৃহত্তম এই ব্লগে। ব্লগের উদারনীতির সুযোগ নিয়ে মত-পথ নির্বিশেষে প্রত্যেকেই এই ব্লগের জনপ্রিয়তাকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাতে দ্বিধা করেনি। করে যাচ্ছে এখনো।
স্বাধীনতাবিরোধীদের চক্ষুশূল সামহোয়্যারইন
ধর্মান্ধ ও ধর্মব্যবসায়ীরা গত কিছুদিন ধরে বেশ আঁটঘাট বেধে ব্লগের পেছনে লেগেছে। তথাকথিত 'আলেম সমাজের ' ব্যানারে গত শুক্রবার এরা সারা দেশেই বিক্ষোভ কর্মসূচির আয়োজন করেছিল। এটি এখন কারোরই অজানা নয় যে, শাহবাগকেন্দ্রিক গণজাগরণের নেপথ্যে যেহেতু ব্লগাররা ছিল, মূলত সেই ব্লগারদের ঘায়েল করতেই 'আলেম সমাজের ' ব্যানারে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবির চক্র ব্লগারদের চরিত্রহনন ও ব্লগ বন্ধ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। প্রতি ৫০ হাজার ব্লগারের মধ্যে একজন হয়তো ধর্ম নিয়ে টানাহেঁচড়া করেন, তাতে কি বাকি সব ব্লগারই ধর্মবিরোধী নাস্তিক হয়ে যান? ইউটিউবের একটি কি দুটি ক্লিপে ইসলাম ধর্মের অবমাননাসূচক বার্তা আছে, তাতে কি পুরো ইউটিউবই বন্ধ করে দিতে হবে? ইন্টারনেট জুড়ে ইসলাম ধর্মের কুৎসা গাওয়া হাজার হাজার ওয়েবসাইট আছে, তার মানে কি সব ওয়েবসাইটই বন্ধ করে দিতে হবে?
বাংলানিউজের হলদে সাংবাদিকতা
বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোরে গত ৯ থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি টানা তিন দিন ধরে সামহোয়্যারইনের বিরুদ্ধে একের পর এক কুৎসা রচনা করা হল। আজ থেকে চার বছর আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণস্বাক্ষর সংগ্রহের অভিযান শুরু করেছিল যে ব্লগটি, তার বিরুদ্ধেই উল্টো অভিযোগ তোলা হল শিবির তোষণের, সার্বভৌমত্ববিরোধী কার্যকলাপের। গত ৫ ফেব্রুয়ারির শুরুতে শাহবাগে ব্যানার হাতে জনাবিশেকও হবে না উপস্থিতি, আজকের গণজাগরণ বিশেষজ্ঞ অনলবর্ষী বক্তারা-টকশোজীবী সুবিধাবাদীরা তখনো শাহবাগ থেকে বহু দূরে, কিন্তু সামহোয়্যারইন পোস্ট স্টিকি করে সেই পাঁচ তারিখেই আওয়াজ তুলেছে - 'রাজাকারের ফাঁসির দাবীতে গর্জে উঠেছে বাংলাদেশ: চল চল শাহবাগ চল।' তবু সামহোয়্যারইন নাকি শাহবাগ নিয়ে বিতর্কিত ভূমিকায়! কেবল তাই নয়, হলুদ সাংবাদিকতার নিকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে ওঠা বাংলানিউজ এই ফাঁকে একপ্রস্থ ভয় দেখানোর চেষ্টাও করেছে সামহোয়্যারকে। বিচারের ভার ব্লগারদের হাতে।
আমার দেশের ধারাবাহিক কুৎসা
বেশ কিছুদিন ধরে স্বাধীনতা বিরোধীদের মুখপত্র হয়ে ওঠা 'আমার দেশ' ও যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেম আলীর 'নয়াদিগন্ত' রীতিমতো প্রধান প্রতিবেদন-বিশেষ প্রতিবেদন সাজিয়ে সামহোয়্যারইনকে নগ্নভাবে আক্রমণ তো করছেই, সঙ্গে ধর্মান্ধদের জন্য তৈরি করে দিচ্ছে উস্কানির তাজা সব উপকরণ। গত ২০ ফেব্রুয়ারি আমার দেশের প্রধান প্রতিবেদন ছিল - "ব্লগে নাস্তিকতার নামে কুত্ সিত অসভ্যতা।" মাত্র তিন জন ব্লগারের লেখালেখির ওপর ভিত্তি করে ফোলানো-ফাঁপানো ওই প্রতিবেদনে বাকি সব ব্লগারকেই 'অসভ্য' বলে ঢালাও আক্রমণ করা হয়। মজার ব্যাপার হল, ১১ ফেব্রুয়ারি বাংলানিউজ বায়বীয় সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগ ফেঁদে বসে, সামহোয়্যার শিবির-তোষণ করছে। এর মাত্র নয় দিন পর ২০ ফেব্রুয়ারি জামায়াত-শিবিরের মুখপত্র 'আমার দেশ' ঠিক তার উল্টো অভিযোগ তুলে বসে। এক প্রতিবেদনে তারা উস্কানি যুগিয়েছে এভাবে - "যেখানে আওয়ামী লীগ সরকারের যৌক্তিক সমালোচনার কারণেও ব্লগ বাতিল করা হয়, সেখানে ধর্ম নিয়ে অশ্লীলতার পরও কীভাবে এরা পার পেয়ে গেছে বিকৃত মানসিকতার নাস্তিক ও আওয়ামী সমর্থিত পাণ্ডারা? কী এজেন্ডা নিয়ে সামহোয়্যারইন ব্লগ পরিচালিত হচ্ছে? শান্তির ধর্ম, মানবতার ধর্ম ইসলাম অবমাননাকারীদের ‘লালন’ করার সাহস কোথায় পেয়েছে সামহোয়্যারইন ব্লগ মালিক কর্তৃপক্ষ?"
২২ ফেব্রুয়ারিও শীর্ষ প্রতিবেদন করা হয় এই শিরোনামে - "ধর্ম ও আদালতের অবমাননা করছে ব্লগারচক্র"। যথারীতি ওই প্রতিবেদনেও মাত্র পাঁচ জন ব্লগারের কর্মকাণ্ডের জন্য বাকি সব ব্লগারের শাস্তি দাবি তো বটেই, সামহোয়্যারইনসহ বিভিন্ন ব্লগ বন্ধ করে দেওয়ার দাবিও জানানো হয়। এগুলোই নয় কেবল, গত কিছুদিন ধরে এই পত্রিকাটি ব্লগ ও ব্লগারদের বিরুদ্ধে একের পর এক কুৎসা গেয়ে যাচ্ছে, এমনকি ব্লগারদের ফাঁসি দেওয়ারও আহ্বান জানাচ্ছে। যেন বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির প্রতিশোধ পত্রিকাটি নেবেই নেবে! সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হচ্ছে, ব্লগমণ্ডলে সুপরিচিত সেই সাইবার ক্রিমিনাল চক্রটি আমার দেশের মন্তব্যের ঘরে এসে চালিয়ে যাচ্ছে সেই নোংরা কাজটি। Iam Bangladeshi নামে একটি ভুয়া ফেসবুক নিক থেকে জানার নাম ও ফোন নম্বর তুলে দিয়ে অশালীন ও অসত্য মন্তব্য শুধু ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপেই নয়, করা হচ্ছে আমার দেশ অনলাইন সংস্করণের বিভিন্ন প্রতিবেদনের নিচেও।
হোয়াইট কলার 'প্রগতিশীল'
আজ থেকে চার বছর আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণস্বাক্ষর সংগ্রহের মতো অভিনব উদ্যোগ এই সামহোয়্যারইনই নিয়েছিল প্রথম। পাশাপাশি জনসমক্ষে সেটাকে উপস্থাপনের ভারও স্বেচ্ছায় নেয় সামহোয়্যারইন। এই সামহোয়্যারইনই প্রথম দেশ ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী লেখালেখির বিপক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়ে নীতিমালায় বিশেষ ধারা সংযোজন করে। অনলাইনে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির সঙ্গে সবচেয়ে স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইগুলোও হয়েছে এই সামহোয়্যারইনেই। গত কয়েক বছরে প্রগতিশীল এমন কোনো আন্দোলন নেই, যেখানে সামহোয়্যারইন কিংবা তার ব্লগারদের ভূমিকা ছিল না। এমনকি তেল-গ্যাস রক্ষা আন্দোলন কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ফি বৃদ্ধির মতো আন্দোলনেও সামহোয়্যার রেখেছে অসামান্য ভূমিকা।
তারপরও সামহোয়্যারইনকে পরীক্ষা দিতে হয় অথর্ব, মেধাহীন-মতলববাজ, সাইবার ক্রিমিনালদের কাছে। এটা এখন অনেকেরই জানা যে, স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিই নয় কেবল, গণজাগরণ মঞ্চের আশেপাশেও কিছু স্বার্থান্বেষী ঘুর ঘুর করেন সামহোয়্যারের গলায় দড়ি ঝোলানোর মতলব নিয়ে। এই কদিনে কম চেষ্টা হয়নি গণজাগরণ মঞ্চ থেকে এটা বলানোর - "সামহোয়্যারইন একটি ছাগুব্লগ।" সেই চেষ্টা এখনো চলছে। যদিও এখন পর্যন্ত গণজাগরণ মঞ্চের পরিচালকদের তারা এই অপকর্মে রাজি করাতে পারেনি। পারলেই বা কী! শাহবাগ গণজাগরণের সঙ্গে সামহোয়্যারইনের সম্পর্কটা নাড়ির। ওই গণজাগরণের ভিত্তিটা গড়ে দিয়েছিল এই সামহোয়্যারইনই। এই সত্যটুকুও অনেকে অস্বীকার করতে চান। কাদের মোল্লার ফাঁসি চেয়ে শাহবাগে যখন ব্লগাররা গেলেন, সংখ্যা তখনও একেবারেই হাতেগোনা। তাদেরও বেশিরভাগই ছিলেন এই সামহোয়্যারের ব্লগার। সেই পাঁচ তারিখেই পোস্ট স্টিকি করে সামহোয়্যারইন...ব্লগ আওয়াজ তুলেছে - 'রাজাকারের ফাঁসির দাবীতে গর্জে উঠেছে বাংলাদেশ: চল চল শাহবাগ চল।
জানাকে নিয়ে বিপজ্জনক নোংরামি
জানা ও আরিলকে অশালীনভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে বারবার। তাদের শিশুকন্যাটিও ওই কুৎসিত থাবা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। না, এ কোনো স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের কাজ নয়। প্রগতিশীলতার মুখোশ পরে যারা ব্লগে-ফেসবুকে ঘোরাফেরা করে, নিজেকে নেতা বানানোর চেষ্টায় যারা মরিয়া, নিজের নাক কেটে যারা পরের যাত্রা ভঙ্গ করতে সিদ্ধহস্ত, তারাই নোংরা এই কাজটি করে যাচ্ছে খুব পরিকল্পিতভাবে। এর আগে এই চক্রটিই কয়েকজন নারী ব্লগারের নাম দিয়ে অশ্লীল সাইট তৈরি করে, ভুয়া ভিডিও ক্লিপ তৈরি করে ইন্টারনেটে ছেড়ে দিয়েছিল। জানাকে নিয়ে ব্লগস্পট-ওয়ার্ডপ্রেসে অশালীন সাইট খোলা হয়েছে। ছবি বিকৃত করে নানান অপপ্রচার চলেছে। কিন্তু সামহোয়্যারইন তো নয়ই, জানাও তাতে এতোটুকু দমেননি। পরিস্থিতির সুযোগ বুঝে এবার সেই চক্রটিই জানার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে উঠে পড়ে লেগেছে নতুন উদ্যমে, আরো নোংরা কৌশল নিয়ে, আরো বিপজ্জনক উপায়ে। রাতভর যে 'মুক্তিযুদ্ধ গবেষকের' মূল কাজ ইন্টারনেটে চেনা-অচেনা পর্নো ক্লিপ আপলোড করা, রগরগে চটি লেখা - তিনিও এখন বিদগ্ধ ব্লগার সেজে সামহোয়্যারকে একহাত দেখে নেওয়ার চেষ্টায় রাতদিন শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। চার-পাঁচদিন আগে হঠাৎই জানার মোবাইলে কিছু কল আসা শুরু হল। সেই সব কলে অশ্লীল যৌন ইঙ্গিতবহ নানা প্রস্তাব দেওয়া হতে লাগলো। পরে গুগল করে অন্তত দুটি গ্রুপের খোঁজ পাওয়া গেল, যেখানে জানার নাম ও ব্যক্তিগত ফোন নম্বর ব্যবহার করে অশ্লীল স্ট্যাটাস প্রচার করা হয়েছে। লক্ষ্য দুটি- প্রথমত জানার ভাবমূর্তিতে কালিমা লেপনের চেষ্টা, দ্বিতীয়ত সামহোয়্যারইন ব্লগটিই বন্ধ করে দেওয়া।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, জানা-আরিল দুজনেই জামায়াত-শিবির অপশক্তির হিটলিস্টে আছেন। বাংলাভাষাভাষীদের মুক্তমত প্রকাশের জায়গা করে দিয়ে দুজনেই এখন তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কায় দিনরাত কাটাচ্ছেন। বাংলা আর বাংলাদেশকে ভালোবেসে যে আরিল্ড ক্লকারহগ এবং সৈয়দা গুলশান ফেরদৌস জানা বিপুল ব্যয়ভার বহন করে বাংলাভাষায় প্রথম কমিউনিটি ব্লগটি প্রতিষ্ঠা করে ছয় ছয়টি বছর ধরে কঠিন এই বোঝা টেনে চলেছেন, লাখ লাখ বাংলাভাষীকে ব্লগমাধ্যমটির সঙ্গে প্রথম পরিচিত করিয়েছেন, সেই তারাই আজ একদিকে একদল হিংস্র পশুর রক্তচক্ষুর মুখোমুখি, অন্যদিকে প্রগতিশীলতার মুখোশ পরা আরেক দল মানসিক রোগীর নোংরা খেলার শিকার। এই দুর্বৃত্তদের হাত থেকে বাঁচাতেই হবে আমাদের প্রিয় ব্লগকে।
কেউ কি টের পাচ্ছেন, প্রিয় সামহোয়্যারের ভেতরে কী রক্তক্ষরণ চলছে!
সংযুক্তি
প্রথম প্রকাশ : সামহোয়্যারইন... ব্লগ
প্রথম প্রকাশ : সামহোয়্যারইন... ব্লগ



